ভগবান হনুমান নাকি আজও জীবিত! এই আবেগের সঙ্গেই পালিত হয় হনুমান জয়ন্তী
শোনা যায়, ভগবান হনুমান নাকি আজও জীবিত-অমরত্বের বর পেয়েছিলেন তিনি স্বয়ং শ্রীরামের কাছ থেকে। তাই বিশ্বাস, যেখানে রামকথা উচ্চারিত হয়, সেখানেই অদৃশ্যভাবে উপস্থিত থাকেন তিনি। এই অদেখা উপস্থিতির বিশ্বাসই ভক্তদের মনে এক অদ্ভুত আবেগের জন্ম দেয়-যেন তিনি দূরের কোনও দেবতা নন, বরং চিরন্তন এক সঙ্গী, এক রক্ষাকর্তা।

এই আবেগকেই সঙ্গে নিয়ে দেশজুড়ে পালিত হয় হনুমান জয়ন্তী।ভগবান হনুমানের জন্মতিথি। শক্তি, ভক্তি, সাহস ও নিঃস্বার্থ আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতি বছর এই দিনে প্রার্থনা, উপবাস, মন্দির দর্শন এবং হনুমান চালিশা ও সুন্দরকাণ্ড পাঠের মধ্য দিয়ে ভক্তরা নিজেদের ভক্তি নিবেদন করেন। তবে এই উৎসবের সবচেয়ে বিশেষ দিক হল এর বহুরূপী প্রকাশ। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, ভিন্ন সংস্কৃতি ও রীতিনীতির ছোঁয়ায় হনুমান জয়ন্তী যেন এক একটি আলাদা রূপ। কোথাও চৈত্র পূর্ণিমায়, কোথাও আবার আঞ্চলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী ভিন্ন সময়ে পালিত হয় এই উৎসব।
উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা ও বিহারের মতো উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে চৈত্র পূর্ণিমার ভোর থেকেই শুরু হয় ভক্তদের আনাগোনা। স্নান সেরে মন্দিরে গিয়ে দিনভর পুজো, আরতি এবং ধর্মগ্রন্থ পাঠে অংশ নেন তাঁরা। অনেকেই উপবাস পালন করেন এবং সন্ধেয় প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে তা ভঙ্গ করেন। ফুল ও আলোকসজ্জায় সেজে ওঠা মন্দির এবং বোঁদে-লাড্ডুর প্রসাদ এই দিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহারাষ্ট্রে এই উৎসব যেন এক উচ্ছ্বাসের ঢেউ। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এখানে প্রধান আকর্ষণ, যেখানে ভগবান হনুমানের মূর্তি নিয়ে রাস্তায় নামেন অসংখ্য ভক্ত। ভজন ও ধর্মীয় সঙ্গীতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। পাশাপাশি মন্দিরে রামায়ণ ও হনুমান চালিশা পাঠের পাশাপাশি ভান্ডারার আয়োজন করা হয়, যেখানে সকলের জন্য বিনামূল্যে আহারের ব্যবস্থা থাকে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে আবার এই উৎসবের সময় ও ধরনে রয়েছে অন্য মাত্রা। কর্ণাটকে ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে পালিত হয় হনুমান জয়ন্তী, অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় কয়েকদিন ধরে চলে উৎসব। ভক্তরা হনুমানের মূর্তিতে সিঁদুর ও তেল মাখান, পানপাতা নিবেদন করেন এবং ভজন-কীর্তনের মাধ্যমে পরিবেশকে ভক্তিময় করে তোলেন।তামিলনাড়ু ও কেরলে তুলনামূলকভাবে শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশেই পালিত হয় এই দিনটি। ভোরে মন্দিরে গিয়ে মাখন, বড়ার মালা ও তুলসী পাতা নিবেদন করেন ভক্তরা। বিশেষ অভিষেক এবং ধর্মগ্রন্থ পাঠই এখানে উৎসবের মূল আকর্ষণ। গুজরাত ও রাজস্থানে উপবাস, দান ও সৎসঙ্গের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় হনুমান জয়ন্তী। অনেক ভক্ত হনুমান চালিশা ১০৮ বার পাঠ করেন। তাতে জীবনের বড় কোনো সংকট, নেতিবাচক শক্তি ও ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।অনেকেরই বিশ্বাস, মানসিক শান্তি, কর্মক্ষেত্রে সফলতা এবং মনস্কামনা পূরণ হয়।
সব মিলিয়ে, হনুমান জয়ন্তী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি ভক্তি, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা।
