ছেলের জন্য জীবনের সহজপাঠ! প্রয়াণের পর নেটদুনিয়ায় ভাসছে রাহুলের আবেগের সেই চিঠি!

0

তিনি নেই, কিন্তু ছেলেকে একসময়ে লেখা সহজ-বার্তা এখনও রয়ে গেছে সমাজ মাধ্যমে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণের পরই সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ছেলেকে লেখা এক আবেগঘন চিঠি। রাহুল যা লিখেছিলেন তাঁর একমাত্র পুত্র সহজের উদ্দেশে। ২০২১ সালের ফাদার্স ডে’তে লেখা সেই চিঠিতে ফুটে উঠেছে এক বাবার ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা। যা পরে ফের অশ্রুসজল ভক্তরা।
চিঠিতে রাহুল নিজের ও প্রাক্তন স্ত্রী অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সম্পর্ক, তাঁদের লড়াইয়ের দিন এবং অভিনয় জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার গল্প তুলে ধরেন। ছেলেকে তিনি শেখাতে চেয়েছেন মানুষের প্রতি সম্মান, বিনয় ও মূল্যবোধের গুরুত্ব। ব্যক্তিজীবনে ২০১০ সালে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে বিয়ে করেন রাহুল। তবে ২০১৭ সাল থেকে আলাদাভাবে বসবাস শুরু করেন এই দম্পতি, পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তাদের একমাত্র সন্তান সহজ।
তিনি লেখেন, জীবনে সাফল্য আসলেও যেন কখনও মানুষকে ছোট করে না দেখা হয়। ছেলের প্রতি মায়ের আত্মত্যাগের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন রাহুল। তিনি জানান, সন্তানেরা অনেক সময় মায়ের ত্যাগ পুরোপুরি বুঝতে পারে না, তাই মায়ের প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা দেখানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সহজকে লেখা শেষ চিঠিতে রাহুল লিখেছেন, ‘এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদার্স ডে’ বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদার্স ডে’, ‘মাদার্স ডে’- এগুলো আলাদা করে জানতো না। কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এসব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত। জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যে হেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের শট নেওয়া হতো। আর আমরা দু’জন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মেরে যেতাম। তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দু’জন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো? যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা। এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?
তিনি শেষাংশে আরও লেখেন, ‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ (হাঃ হাঃ), দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই। আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক’টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এরপর থেকে। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার…।’
পাশাপাশি জীবনভর অর্জিত অভিজ্ঞতা, অনুভূতি আর ভালোবাসাকেই উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে দেন তিনি। রাহুল, একজন অভিনেতা হিসেবে যেমন সফল ছিলেন, তেমনই একজন সংবেদনশীল মানুষ ও স্নেহশীল বাবা হিসেবেও রাহুলকে নতুন করে চিনছে মানুষ। তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই চিঠিই আজ হয়ে উঠেছে অগণিত না–বলা আবেগের প্রতিচ্ছবি—যা চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে অসংখ্য ভক্তের।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed