প্রয়াত অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব তমাল রায়চৌধুরী, স্মৃতিচারণায় ভাসছে টলিউড ও নাট্যমহল
প্রয়াত বাংলা নাট্যমঞ্চ ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম আলোচিত প্রবীণ অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক তমাল রায়চৌধুরী। সোমবার ভোররাতে ঘুমের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আশির উপর। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া টলিউড ও নাট্য মহলে।
শিল্পী সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। হৃদ্রোগের সমস্যাও ছিল এবং শরীরে পেসমেকার বসানো ছিল। সোমবার ভোররাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে ঘুমের মধ্যেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। সকালে গৃহপরিচারিকা ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া না পেলে চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। চিকিৎসক এসে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বর্ষীয়ান অভিনেতার মরদেহ সোমবার বিকালে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় নিয়ে আসা হয় । শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। সহকর্মী, বন্ধু এবং অনুরাগীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন সেই জন্যই নিয়ে আসা হয়েছিল অভিনেতাকে। এরপর কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।
মঞ্চ ও চলচ্চিত্র, দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন তমাল রায়চৌধুরী। অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যনির্দেশক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে নোবেল চোর, চাঁদের পাহাড়, জাতিস্বর এবং দ্য নেমসেক। তাঁর প্রয়াণের খবরে সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করেছেন বহু অভিনেতা-পরিচালক। অভিনেতা সোহন বন্দোপাধ্যায় স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, নাটকের মহড়ার দিন একবার মজার ছলে তাঁদের দেখে “অ্যা বাঞ্চ অফ ব্যাড অ্যাকটরস!” বলে মন্তব্য করেছিলেন তমালবাবু, মজার ছলেই এই মন্তব্য করেছিলেন তিনি। সেই মুহূর্তে কেউ অপমানিত না হয়ে বরং হেসে ফেলেছিলেন সকলে। সহকর্মীদের মতে, এভাবেই রসিকতা ও সহজ কথার মধ্য দিয়েই অনেক সত্যি কথা বলতেন তমালবাবু।
অন্যদিকে অভিনেতা জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁর প্রথম গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল তমাল রায়চৌধুরীর নির্দেশনায়। তাঁর কথায়, “অনেক স্মৃতি। লিখতে বসলে একটা আস্ত বই লেখা যায়। অপ্রিয় সত্য কথা মজার ছলে ‘দাঁড়া তোকে একটু অপমান করি’ বলে অবলীলায় বলে ফেলাটা শেখার মতন ছিল। অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে। অনেক কিছু। রাজার মতন চলে যাওয়া মনে হয় একেই বলে।”
চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্তও স্মরণ করেছেন অভিনেতার তীক্ষ্ণ রসবোধ ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের কথা। তিনি লিখেছেন, মাত্র কয়েক মাস আগেও তমালবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছিল। সেই প্রাণবন্ত মানুষটির এমন হঠাৎ বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন।
অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা ও নাট্যচিন্তায়ও গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। বহু তরুণ অভিনেতা-পরিচালকের অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনি। টলিউডের অনেকেই তাঁকে ‘গুরু’ বলে মনে করতেন। বাংলা নাট্যমঞ্চ ও চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদান এবং ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন মনে রাখবেন সহকর্মী ও দর্শক। তাঁর প্রয়াণে বাংলা বিনোদন জগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
