মাটির রাজনীতি থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শি!  ‘জায়ান্ট কিলার’ থেকে বাংলার ক্যাপ্টেন শুভেন্দু অধিকারী

0



বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, দলবদল, আন্দোলন, সংঘাত এবং পর পর দুই ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়ের পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসলেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দু’দুবার নির্বাচনে হারিয়ে এখন তিনি গেরুয়া শিবিরের সবচেয়ে বড় মুখ। কিন্তু এই উত্থানের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। বরং হার, অপমান, মতাদর্শের সংঘাত এবং নিজের রাজনৈতিক জমি তৈরি করার দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই আজকের ‘মুখ্যমন্ত্রী’ শুভেন্দু।
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির অধিকারী পরিবার বরাবরই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কেন্দ্রে ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শুভেন্দুর ঠাকুরদা কেনারাম অধিকারী।ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জেলও খেটেছেন তিনি। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই পরবর্তীতে বহন করেন শিশির অধিকারী এবং তাঁর ছেলে শুভেন্দু। তবে ছোটবেলায় রাজনীতির চেয়ে আধ্যাত্মিকতার প্রতিই বেশি ঝোঁক ছিল শুভেন্দুর। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিয়মিত রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন তিনি। একসময় তো সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নেবেন বলেও আশঙ্কা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। যদিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন তিনি।এখনও পর্যন্ত অকৃতদার শুভেন্দুর জীবনজুড়ে রাজনীতিই প্রধান পরিচয়।
আটের দশকের শেষ দিকে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ছাত্র পরিষদের কর্মী হিসেবে কংগ্রেস রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের কিছুদিনের মধ্যেই যোগ দেন সেই দলে। শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
তবে শুরুটা সাফল্যের ছিল না। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে এবং ২০০৪ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে হারের মুখ দেখতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই হারই যেন তাঁকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে। ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন শুভেন্দু। তারপরই আসে নন্দীগ্রাম আন্দোলন। ২০০৭ সালের জমি আন্দোলন কার্যত বদলে দেয় শুভেন্দুর রাজনৈতিক পরিচিতি। সিপিএম বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল-যা ছিল বাম শাসনের ভিত কাঁপানোর বড় মুহূর্ত। এরপর যুব তৃণমূলের সভাপতির দায়িত্বও পান তিনি।
২০০৯ সালে লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে প্রথমবার তমলুকের সাংসদ হন শুভেন্দু। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর আরও শক্তিশালী হয় অধিকারী পরিবারের প্রভাব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে তাঁর। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান, সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং একাধিক পর্যবেক্ষক পদ হারানোর পর সম্পর্কের অবনতি চরমে পৌঁছয়।অবশেষে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। আর তারপরই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে ক্রমশ বিজেপির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন বাংলায়।এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে কার্যত নিজের রাজনৈতিক উচ্চতাকে নতুন মাত্রা দেন শুভেন্দু। বিজেপির বাংলা জয়ের অন্যতম স্থপতি হিসেবেই এখন তাঁকে দেখা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত জীবনেও শুভেন্দু বরাবরই ব্যতিক্রমী। তাঁর নামে বিপুল সম্পত্তির অভিযোগ থাকলেও হলফনামা বলছে, স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা। রয়েছে কৃষিজমি, একটি বাড়ি ও দুটি ফ্ল্যাট। কোনও ঋণ, গাড়ি বা সোনার গয়না নেই তাঁর নামে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তা তাঁকে থামাতে পারেনি।
নন্দীগ্রামের আন্দোলনের মাটি থেকে উঠে আসা শুভেন্দু অধিকারী আজ বাংলার প্রশাসনিক শীর্ষে। বিরোধী আন্দোলনের মুখ থেকে মুখ্যমন্ত্রী, এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি যেমন বিতর্কিত, তেমনই প্রভাবশালী। আর সেই কারণেই বর্তমান বাংলার রাজনীতিতে কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীই এখন প্রধান মুখ।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *