ব্রিগেডের জনসমুদ্রে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, প্রথম বিজেপি সরকারকে ঘিরে আবেগে ভাসল বাংলা
যে পদ্ম আগে ১ থেকে ২ টাকায় বিক্রি হত, এখন মল্লিকঘাটে সেটাই ৮ থেকে ১০ টাকা। শহরতলিতে দাম পৌঁছেছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়! এটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথ। আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ঘিরে শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড যেন পরিণত হয়েছিল গেরুয়া আবেগের মহাসমুদ্রে। জনতার ঢল, দেশজোড়া বিজেপি নেতৃত্বের উপস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর ‘নবনির্মাণের বাংলা’র ডাক- সব মিলিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা দেখল রাজ্য।

রাজ্যপাল আর এন রবির উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম টুডু। বাকি মন্ত্রীদের শপথ হবে সোমবার লোকভবনে। তবে কোন মন্ত্রী কোন দপ্তর পাচ্ছেন, তা এখনও ঘোষণা হয়নি।


শপথের আগেই ব্রিগেডে তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বায়ুসেনার হেলিকপ্টারে সরাসরি ব্রিগেডে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে খোলা ছাদের গাড়িতে শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে পাশে নিয়ে জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন তিনি। ময়দান তখন কানায় কানায় পূর্ণ। মাঠজুড়ে গেরুয়া পতাকা, শঙ্খধ্বনি আর ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ব্রিগেড। মঞ্চে উঠে প্রথমেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তারপর মঞ্চের মাঝখানে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে জনতার উদ্দেশে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেন তিনি। সেই দৃশ্য ঘিরে মুহূর্তে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে ব্রিগেডে। পরে ৯২ বছরের প্রবীণ বিজেপি কর্মী মাখনলাল সরকারকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করেন মোদি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাশ্মীর যাত্রার সঙ্গী থাকা ওই প্রবীণ কর্মীকেও জড়িয়ে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

শপথ নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীও আবেগঘন বার্তা দেন। প্রধানমন্ত্রীকে প্রণাম জানিয়ে সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘আপনার আশীর্বাদ এবং পরামর্শ আমার পথ চলার সঙ্গী।’ পাশাপাশি তাঁর দাবি, ‘বিকশিত ভারতের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে বিকশিত বাংলা।’ পরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে কবিগুরুর মূর্তিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি বলেন, ‘বাংলার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। শিক্ষা হারিয়ে গেছে, সংস্কৃতি ধ্বংস হয়েছে। এখন দায়িত্ব নেওয়ার সময়, রাজনৈতিক সমালোচনার নয়।’

শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নয়, ব্রিগেডের মঞ্চে কার্যত হাজির ছিল গোটা এনডিএ পরিবার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, জেপি নাড্ডা-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ, মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফড়ণবীস, অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, দিল্লির রেখা গুপ্ত, ত্রিপুরার মানিক সাহা, বিহারের সম্রাট চৌধুরী-সহ একাধিক মুখ্যমন্ত্রীও হাজির ছিলেন অনুষ্ঠানে। রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্চিমবঙ্গে একসঙ্গে এত সংখ্যক মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমাবেশ কার্যত নজিরবিহীন।
১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, যখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায়। আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল ইতিহাসের ব্রিগেড- যেখানে একদিকে শপথ নিল নতুন সরকার, অন্যদিকে জনতার আবেগে যেন নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা দেখল বাংলা।
