অন্নই ব্রহ্ম! কীভাবে শুরু হয়েছিল প্রচলিত এই অন্নপূর্ণাপুজো?
অন্নপূর্ণাপুজো হল হিন্দু ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ পূজা।যেখানে মা অন্নপূর্ণা-র আরাধনা করা হয়। ‘অন্নপূর্ণা’ শব্দের অর্থ যিনি অন্ন (খাদ্যে) পরিপূর্ণ করেন বা সকলকে খাদ্য দান করেন। তিনি মূলত মা পার্বতী-র এক রূপ, যিনি ভগবান শিবের সহধর্মিণী।এই পুজোর মূল ভাবনা—’অন্নই ব্রহ্ম’, অর্থাৎ খাদ্যই জীবনের মূল শক্তি।
অন্নপূর্ণা পুজোর উৎপত্তি সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একবার ভগবান শিব বলেছিলেন যে ‘এই জগৎ মায়া এবং অন্নও মায়া।’ এই কথায় দেবী পার্বতী রুষ্ট হয়ে পৃথিবী থেকে সমস্ত অন্ন সরিয়ে নেন। ফলে সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, দেবতা থেকে মানুষ—সবাই চরম কষ্টের মধ্যে পড়ে। এই অবস্থায় শিব নিজেই উপলব্ধি করেন যে অন্ন ছাড়া জীবন অসম্ভব। তখন তিনি বারাণসীতে গিয়ে মা অন্নপূর্ণার কাছে ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। দেবী তাঁকে অন্নদান করেন এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়—অন্ন কোনও মায়া নয়, বরং জীবনের মৌলিক সত্য।
ঐতিহাসিক দিক থেকে অন্নপূর্ণা পুজোর শিকড় প্রাচীন ভারতের কৃষিনির্ভর সমাজে নিহিত। সেই সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি ও কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। বৃষ্টি, ফসল এবং খাদ্য উৎপাদন—সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত। তাই খাদ্যের দেবীর পুজোর মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করত যেন তাদের জীবনে অভাব না আসে। এই সামাজিক প্রয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন ঘটে।
অন্নপূর্ণা পুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল বারাণসীর অন্নপূর্ণা মন্দির, যা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। তবে এখন শুধু কাশী নয়, পশ্চিমবঙ্গের বহু বনেদি বাড়ি এবং মন্দিরেও এই পুজো ভক্তিভরে পালিত হয়।
এই পুজো সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ের কিছু ভিন্নতা দেখা যায়। পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় ঘর পরিষ্কার ও পবিত্র করার মাধ্যমে। এরপর প্রতিমা বা ছবির সামনে ফুল, ধূপ, প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। বিশেষভাবে ভাত, ডাল, সবজি, খিচুড়ি ও মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়, যা অন্নের প্রতীক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্নপূর্ণা পুজোর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল ‘অন্নদান’। এই দিনে দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়, যা ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোচ্চ দান হিসাবে বিবেচিত। সব মিলিয়ে, অন্নপূর্ণা পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এখানে ধর্ম, দর্শন, সমাজ এবং মানবিকতা একসূত্রে গাঁথা।
