৬৩৬ দিন পর প্রথমবার গোলহীন হালান্ড! বেলিংহ্যামের জোড়া আঘাতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড
ফুটবল কখনও এক নায়কের উত্থানের গল্প, আবার কখনও আরেক নায়কের বেদনার কাব্য। মায়ামির রাতে সেই দুই গল্প একসঙ্গেই লেখা হলো। একদিকে জুড বেলিংহামের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হলো ইংল্যান্ড, অন্যদিকে নিভে গেল আর্লিং হালান্ডের স্বপ্ন। ১২০ মিনিটের নাটকীয় লড়াই শেষে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। আর এই জয়ের নায়ক নিঃসন্দেহে বেলিংহ্যাম।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল নরওয়ের। আন্দ্রেয়াস শেলডেরুপের গোলে এগিয়ে গিয়ে ব্রিটিশদের চাপে ফেলে দিয়েছিল ভাইকিংরা। মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ডের নিয়ন্ত্রণ আর সামনে হালান্ডের উপস্থিতি বারবার আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল ইংল্যান্ডের রক্ষণে। যদিও গোল পাননি হালান্ড, তবু তাঁর দৌড়, শারীরিক শক্তি আর উপস্থিতি ইংল্যান্ডকে পুরো ম্যাচে সতর্ক রেখেছিল।

কিন্তু বড় ম্যাচে বড় তারকারা নিজেদের আলাদা করেই চেনান। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে অ্যান্থনি গর্ডনের পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফেরান জুড বেলিংহ্যাম। সেই গোল ঘিরেই পরে তৈরি হয় বিতর্ক। নরওয়ের দাবি, গোলের আগে বল ক্যামেরার তারে লেগে গতিপথ বদলেছিল। মাঠে প্রতিবাদ করেন হালান্ড, ওডেগার্ডরা। পরে ফিফা জানায়, ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তির তথ্য অনুযায়ী বল কোনো তার স্পর্শ করেনি। তবু বিতর্ক থামেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ে আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। কর্নার থেকে তোরবিয়র্ন হেগেম বল জালে জড়ালেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সহায়তায় গোল বাতিল হয়। কারণ, তার আগে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দিয়ে ফাউল করেছিলেন আর্লিং হালান্ড। যে মুহূর্তে নরওয়ে উল্লাসে মেতেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের স্বপ্নে নেমে আসে অন্ধকার। ম্যাচের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে হালান্ডের সেই একটি ভুল। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবারও সামনে এলেন বেলিংহ্যাম। মর্গান রজার্সের শট গোলরক্ষক ঠিকমতো আটকাতে না পারলে ফিরতি বলে সহজেই জালে পাঠিয়ে দেন তিনি। জোড়া গোলে ইংল্যান্ডকে পৌঁছে দেন শেষ চারে। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই বিশ্বকাপের নকআউটে টানা দুই ম্যাচে একাধিক গোল করে তিনি জায়গা করে নিলেন কিংবদন্তি পেলের পাশে।

অন্যদিকে হালান্ডের জন্য দিনটা ছিল হতাশার। জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৪ ম্যাচে গোল করার পর অবশেষে থামল তাঁর গোলযাত্রা। ৬৩৬ দিন পর প্রথমবার গোলহীন মাঠ ছাড়লেন নরওয়ের এই গোলমেশিন। শুধু গোল না পাওয়াই নয়, তাঁর করা ফাউলের কারণে বাতিল হয়ে যায় নরওয়ের সম্ভাব্য দ্বিতীয় গোল। যে ফুটবলার এতদিন দলকে জয়ের পথে টেনেছেন, তিনিই অজান্তে হয়ে উঠলেন পরাজয়ের অন্যতম কারণ। তবে বিদায়ের পরও মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়েন হালান্ড। বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণেই নরওয়েকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার কৃতিত্ব তাঁরই। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপ তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে এবং নরওয়েকে আবার বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ফিরিয়ে এনেছে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একদিকে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত ফর্ম—বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত লড়াইয়ের মঞ্চ এখন প্রস্তুত। মায়ামির রাত ইংল্যান্ডকে শিখিয়েছে, ম্যাচ যত কঠিন হবে, বেলিংহ্যাম ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন। আর নরওয়েকে মনে করিয়ে দিল, ফুটবলে এক মুহূর্তের ভুলই কখনও কখনও পুরো স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে।
