বিদায়! একটা ‘যুগ’ চলে গেল টুটু বসুর সঙ্গে, মিলিয়ে গেলেন ফুটবল- সংস্কৃতি- রাজনীতি
ময়দানের মানুষ আজও বলেন, অঞ্জন আর টুটু শুধু দুই প্রশাসক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন মোহনবাগানের দুই ফুসফুস।একজন না থাকলে অন্যজনকে যেন অসম্পূর্ণ লাগত। সেই অঞ্জন মিত্র ২০১৮ সালে মোহনবাগানের প্রশাসনিক পদ ছাড়ার এক বছরের মধ্যেই চলে গিয়েছিলেন। আর যেন অদ্ভুত এক নিয়তির টানে, ২০২৫ সালে সভাপতির পদ ছাড়ার ঠিক এক বছরের মাথায় থেমে গেল টুটু বসুর জীবনও। এ কি নিছক কাকতালীয়? নাকি মোহনবাগানের সঙ্গে দুই বন্ধুর নাড়ির টান!
মঙ্গলবার রাতটা তাই শুধু একটা মৃত্যুসংবাদ নয়, যেন সবুজ মেরুন ইতিহাসের বুক থেকে একটা যুগ মুছে যাওয়ার রাত। হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে যখন খবর এল, নেই টুটু বসু, তখন মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ময়দান।৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্বপনসাধন বসু, যাঁকে সবাই চিনত ‘টুটুদা’ বলে। সোমবার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে শহরের এক নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছিল। তখন থেকেই তিনি ছিলেন অচেতন। ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরিবারের তরফে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই যেন শোকের কালো মেঘ নেমে আসে সবুজ মেরুন পরিবারে।

টুটু বসু শুধু একজন সভাপতি ছিলেন না । তিনি ছিলেন ভরসার নাম। ত্রাতা। ক্লাবের বিপদে যাঁর দরজায় সবাই ছুটে যেত। আর্থিক সঙ্কট, প্রশাসনিক ঝড়, সমর্থকদের ক্ষোভ, নতুন ফুটবলারের আব্দার- কত কঠিন পরিস্থিতি যে তিনি সামলেছেন, তার হিসেব হয়তো তাঁর কাছেও ছিল না। ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় তিন দশক ধরে মোহনবাগানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মার মতো। ক্লাবের জয় তাঁর হাসি হয়ে উঠত, আর পরাজয় কষ্ট হয়ে নামত মুখে।
বুধবার সকাল থেকেই বালিগঞ্জের বাড়ির সামনে উপচে পড়া ভিড়। শুধু সমর্থক নন, রাজনৈতিক নেতা, অভিনেতা, প্রাক্তন ফুটবলার, ক্রীড়া সংগঠক সকলেই ছুটে এসেছিলেন তাঁদের ‘টুটুদা’-কে শেষবারের মতো দেখতে। বাড়ি থেকে অফিস, ভবানীপুর ক্লাব হয়ে তাঁর মরদেহ যখন মোহনবাগান তাঁবুতে পৌঁছয়, তখন অনেকেই চোখের জল আটকাতে পারেননি। ক্লাবের সেই চেনা করিডোর, সেই সবুজ-মেরুন পতাকা, সব যেন নিঃশব্দে কাঁদছিল। বিধানসভা থেকে সরাসরি ক্লাবে এসে শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি বলেন, ‘মোহনবাগান ক্লাব, সমর্থক ও টুটুবাবুর সকল শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে আমরা এসেছি। মোহনবাগান সমর্থকদের কাছে আজকের দিনে আমার একটাই প্রার্থনা, যে আত্মিকতা দিয়ে টুটুবাবু মোহনবাগান ক্লাবকে আগলে রেখেছিলেন, আপনারা সেভাবে ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে যান। এটাই হবে ওঁর প্রতি আসল শ্রদ্ধা’।এসেছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক।

শুধু রাজনীতি নয়, এদিন যেন রাজনীতির সব বিভাজন মুছে গিয়েছিল। বিমান বসু, ববি হাকিম, অতীন ঘোষ, স্বপন দাশগুপ্ত সকলেই এসেছিলেন এক মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে, যিনি দলমতের ঊর্ধ্বে ছিলেন।প্রাক্তন ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্যের চোখে তখন শুধুই স্মৃতি। গলা ভারী হয়ে আসা অবস্থায় তিনি বলেন, ‘উনি যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে মোহনবাগানের সেবা করেছেন, তা ভোলা যায় না। টুটুবাবু এত কাজ করেছেন, তা বলে শেষ হবে না। ওঁর প্রয়াণ একটা বড় ক্ষতি’। মোহনবাগান সভাপতি দেবাশিস দত্তের কথায় ছিল এক পিতৃহারা মানুষের যন্ত্রণা, ‘আজ আমি অভিভাবকহীন হয়ে গেলাম’। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল থেকেও উঠে এল একই আবেগ। দেবব্রত সরকার বলেন, ‘টুটু বসু একটা চরিত্র ছিলেন। এমন মানুষ আর আসে না’। প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও পৌঁছে যান মোহনবাগান তাঁবুতে। নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। পরে বলেন,
‘টুটু বাবু আর মোহনবাগান এক। ছোটবেলার বহু স্মৃতি রয়েছে। ক্রীড়াজগতের বর্ণময় চরিত্র ছিলেন।’ মুনমুন সেন ও রাইমা সেন থেকে কল্যাণ চৌবে, লকেট চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, শেষ শ্রদ্ধায় উপস্থিত ছিলেন বহু পরিচিত মুখ। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয় টুটু বসুর শেষকৃত্য।
শেষযাত্রায় শুধু একজন মানুষকে বিদায় জানানো হয়নি। বিদায় নিয়েছে এক সময়, এক সম্পর্ক, এক ময়দানি সংস্কৃতি। একটা যুগ যেন বিলীন হল। অঞ্জন-টুটুর সেই যুগলবন্দি আজ শুধুই স্মৃতি।
