হ্যান্ড অব গড, বেকহ্যামের লাল কার্ড… আবার জ্বলছে পুরনো আগুন
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড মানেই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এই দ্বৈরথে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, বিতর্ক, প্রতিশোধ এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। তাই দুই দল মুখোমুখি হলেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে ভেসে ওঠে আন্তোনিও রাত্তিন, দিয়েগো মারাদোনা কিংবা ডেভিড বেকহ্যামের মতো কিংবদন্তিদের নাম। এবার সেই বহুচর্চিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
দুই দেশের বিশ্বকাপ-দ্বৈরথের শুরু ১৯৬৬ সালে। ইংল্যান্ডে সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখান রেফারি। ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জিতলেও সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে ম্যাচটা অন্যায়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। তার চার বছর আগেই ফকল্যান্ডস (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছিল।

সেই আবেগ নিয়েই কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নামে দুই দল। সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল—দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। হাত দিয়ে গোল করার পরও তা বৈধ বলে জানান রেফারি। কয়েক মিনিট পরই মারাদোনা মাঝমাঠ থেকে একের পর এক ব্রিটিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করেন অবিশ্বাস্য এক গোল, যা আজও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। পরে নিজের আত্মজীবনীতে মারাদোনা লিখেছিলেন, ‘এটা শুধু একটা ফুটবল দলকে হারানো ছিল না, একটা দেশকে হারানোর অনুভূতি ছিল। মালভিনাস যুদ্ধে যারা প্রাণ হারিয়েছিল, তাদের কথা আমাদের মনে ছিল।’ সেই মন্তব্যই বুঝিয়ে দেয়, ম্যাচটা শুধুই ফুটবলের ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জাতীয় আবেগও।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন। দশজনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। সেই লাল কার্ড দীর্ঘদিন বেকহ্যামের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হয়ে ছিল। চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে আসে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ। গ্রুপ পর্বে বেকহ্যামের পেনাল্টির গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে আগের হারের বদলা নেয় থ্রি লায়ন্স। এরপর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপে আর দেখা হয়নি দুই দলের।

এবার সেই অপেক্ষার অবসান। আর বাড়তি আকর্ষণ, এই প্রথম বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। একদিকে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশা নিয়ে নামবে ইংল্যান্ড। ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে নাটকের অভাব হয় না। কখনও বিতর্ক, কখনও প্রতিশোধ, কখনও আবার ফুটবল শিল্পের অনন্য প্রদর্শনী। তাই আটলান্টার সেমিফাইনালও শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লেখার অপেক্ষা।
