মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্ক কাটিয়ে আবার বছর ২০ পর… অন্ধকার কারাগার থেকে ঈদের সকালে ফিরল  ছেলে

0


রোজগারের আশায় কেরলের কোঝিকোড় ছেড়েছিলেন তরুণ আবদুল রহিম। কিন্তু সেই সফরই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবনের সব হিসেব। সৌদি আরবের এক জেলে কেটে গেল প্রায় ২০ বছর। মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা, নিঃসঙ্গ কারাবাস আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অন্ধকার শেষে অবশেষে ঈদের দিনে নিজের মাটিতে ফিরলেন ফেরোকের বাসিন্দা আব্দুল রহিম। আর তাঁর এই ঘরে ফেরা যেন শুধুই এক ব্যক্তির মুক্তি নয়, এক মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষারও অবসান।


২০০৬ সালে কাজের সন্ধানে সৌদি আরবের রিয়াধে গিয়েছিলেন রহিম। সেখানে এক দুর্ঘটনায় তাঁর সৌদি বাড়িতে কাজ পায়। দেখাশোনা করতেন বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেকে। কিন্তু সেই ছেলের মৃত্যু হলে তাঁর জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। খুনের দায়ে  গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রহিমকে তাঁর নিয়োগকর্তার ১৭ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী ছেলের দেখাশোনার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল, যে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।  রহিম যখন গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং ওই কিশোর পেছনের সিটে বসা ছিল, তখন অসাবধানতাবশত শ্বাসযন্ত্রটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এর ফলে ছেলেটি মারা যায়। পরে সৌদি আদালত মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়। সৌদি আরবে পৌঁছনোর ২৮ দিনের মাথায় ২৬ বছর বয়সী রহিম অন্ধকারে ডুবে যায়।  সেই সময় থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ আইনি লড়াই। উচ্চ আদালতও এই সাজা বহাল রাখলে কেরালায় তার পরিবার যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে থাকে। অবশেষে ২০২৪ সালের এপ্রিলে নিহত কিশোরের পরিবার ৩৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে রহিমকে ক্ষমা করতে রাজি হয়। রহিমের বাঁচার একমাত্র রাস্তা ছিল ‘দিয়াত’ বা ক্ষতিপূরণের অর্থ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মালয়ালি সমাজ রহিমের পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে তাঁর পাশে।

সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অনুদান মিলিয়ে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। সেই অর্থ গ্রহণ করে নিহতের পরিবার ক্ষমা করলে রহিমের মৃত্যুদণ্ড রদ হয়।সৌদি কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয়, রহিমকে ২০ বছরের কারাদণ্ড পূর্ণ করতে হবে।চলতি বছরের ২০ মে তার সেই মেয়াদ শেষ হয়।  বুধবার রাতে রিয়াধ থেকে বিমানে উঠে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যালিকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন রহিম। বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব এবং বহু শুভানুধ্যায়ী। দীর্ঘ ২০ বছর পর ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন তাঁর মা ফাতিমা। রহিমের চোখেও ছিল অশ্রু। তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, মানুষের ভালোবাসা আর প্রার্থনাই তাঁকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।  এই ঘটনা শুধু এক বন্দির মুক্তির গল্প নয়। এ যেন মানবিকতার জয়, প্রবাসী সমাজের ঐক্য এবং আশাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার এক বিরল উদাহরণ হয়ে রইল।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *