২-০ পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৩ মিনিটে ৩ গোল,
অসম্ভবকে সম্ভব করার নামই লিওনেল মেসি

0



ফুটবলে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ৯০ মিনিটের খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বদলে যেতে পারে যেকোনো গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে যদি থাকেন লিওনেল মেসি, তাহলে অসম্ভবও বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
আটলান্টায় শেষ ষোলোর ম্যাচে ৬৭ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করেছেন মেসি, একের পর এক আক্রমণ ফিরিয়ে দিয়েছেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় তখন যেন সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু এরপরই শুরু হয় মেসির জাদু। এক অ্যাসিস্ট, এক গোল, আর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক হেড—মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ৩-২ ব্যবধানে মিশরকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল লিওনেল স্কালোনির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে মারওয়ান আতিয়ার ভাসিয়ে দেওয়া বলে ইয়াসির ইব্রাহিমের শক্তিশালী হেড এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে জালে জড়ায়। হঠাৎই এগিয়ে যায় মিশর। পাঁচ মিনিট পরই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে বক্সের ভেতর ফাউল করায় পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু ২১ মিনিটে মেসির নেওয়া স্পট-কিক দারুণ দক্ষতায় আটকে দেন মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বকাপে নিজের অষ্টম পেনাল্টির মধ্যে চতুর্থবার ব্যর্থ হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এক বিশ্বকাপেই ২ বার আবার! এরপরও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড, জুলিয়ান আলভারেজের শট এবং মেসির একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে প্রথমার্ধের নায়ক হয়ে ওঠেন মিশরের গোলরক্ষক।
বিরতির পর আক্রমণের ঝাঁজ আরও বাড়ায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু নয়জন খেলোয়াড় নিয়ে রক্ষণে দেয়াল তুলে দাঁড়ায় মিশর। এরই মধ্যে একবার মোস্তফা জিকোর গোল ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল আর্জেন্টিনা শিবিরে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৭ মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে আবারও সামনে চলে আসেন জিকো। এবার আর কোনো বাধা আসেনি। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা।
সেখান থেকেই শুরু আর্জেন্টিনার মহাকাব্য। ৭৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। সেই গোলেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা। আক্রমণের গতি আরও বাড়িয়ে দেয় স্কালোনির দল। ৮৪ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের প্রচেষ্টা প্রতিহত হলেও ফিরতি বল পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে জাল কাঁপান মেসি। গোলরক্ষকের গায়ে লেগে বার ছুঁয়ে বল জালে জড়িয়ে পড়তেই সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টে এটা ছিল তাঁর অষ্টম গোল। একই সঙ্গে টানা ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি।
সমতায় ফিরেও সন্তুষ্ট থাকেনি আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে লাউতারো মার্তিনেজ ডান দিক থেকে নিখুঁত ক্রস বাড়ান। সেই বল দারুণ এক হেডে জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন এনজো ফার্নান্দেজ।
শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেঙে পড়েন মেসি। চোখে জল নিয়ে সতীর্থদের আলিঙ্গন করেন, গ্যালারির দিকে তাকিয়ে অভিবাদন জানান। যে ম্যাচে একসময় বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল আর্জেন্টিনা, সেই ম্যাচেই অধিনায়কের এক গোল ও এক অ্যাসিস্টে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী থাকল ফুটবল বিশ্ব।
পেনাল্টি মিস থেকে নায়ক হয়ে ওঠা, দুই গোল পিছিয়ে থেকেও হাল না ছাড়া, আর শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোলের বিস্ময়—সব মিলিয়ে আবারও প্রমাণ হলো, ফুটবলে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখানোর নামই লিওনেল মেসি।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *