৩৯ বছরে মেসি ও জকোভিচের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, কিংবদন্তিরা কখনও শেষ হয়ে যান না

0



কেউ বলেন বয়স শুধু সংখ্যা। কিন্তু সেই কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে ক’জন? সময় যখন শরীরকে থামিয়ে দিতে চায়, তখন খুব কম মানুষই পারেন সময়ের চোখে চোখ রেখে বলতে- ‘আমি এখনও শেষ হয়ে যাইনি।’ ৭ জুলাই রাতটা ঠিক তেমনই এক রাত। পৃথিবীর দুই প্রান্তে, দুই আলাদা মাঠে, দুই আলাদা খেলায়, একই বয়সের দুই কিংবদন্তি যেন একসঙ্গেই লিখে দিলেন অমর এক গল্প। একজন নোভাক জকোভিচ। অন্যজন লিওনেল মেসি। দু’জনের বয়সই ৩৯। কিন্তু তাঁদের লড়াই দেখে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি সময় তাঁদের ছুঁতে পেরেছে।


লন্ডনের সেন্টার কোর্টে তখন রাত গভীর। ৫ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন নিংড়ে দিয়েছেন জকোভিচ। উইম্বলডনের ইতিহাসে দীর্ঘতম কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ১৪ বছর ছোট ফেলিক্স অগার-আলিয়াসিম। মাঝপথে পায়ের মাসল কাফে সমস্যা, মেডিক্যাল টাইমআউট, বারবার চাপে পড়া, সবকিছু মিলিয়ে যেন অসম্ভব এক পরীক্ষা। কিন্তু জকোভিচের অভিধানে ‘হার’ শব্দটা আজও পুরোপুরি জায়গা করে নিতে পারেনি। তিনটি টাইব্রেক, পাঁচ সেটের ম্যারাথন যুদ্ধ শেষে যখন তিনি জিতলেন, তখন তাঁর মুখে ক্লান্তি ছিল, শরীর ভেঙে পড়ছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক অন্যরকম শান্তি। তিনি বললেন, ‘এই ধরনের ম্যাচের জন্যই এখনও আমি টেনিস খেলি।’ এই একটি বাক্য যেন সেদিন শুধু টেনিস নয়, গোটা ক্রীড়া বিশ্বের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল।


কারণ, কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে আটলান্টাতেও ঠিক একই সময়ে আর এক কিংবদন্তি নিজের খেলায় সেই কথারই প্রমাণ দিচ্ছিলেন। বিশ্বকাপের শেষ ষোলো। মিশরের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। তার ওপর মেসির পেনাল্টি মিস। অধিকাংশ মানুষের চোখে তখন গল্পটা প্রায় শেষ। সমালোচকেরা হয়তো নতুন হেডলাইনও লিখে ফেলেছিলেন।
কিন্তু কিংবদন্তিরা অন্যভাবে গল্প লেখেন।
৮০ মিনিটের পর যেন বদলে গেল সবকিছু। প্রথমে রোমেরোর গোলে প্রত্যাবর্তনের দরজা খুলে দিলেন তাঁর নিখুঁত ক্রসে। তারপর নিজেই করলেন সমতা ফেরানো গোল। আর যোগ করা সময়ে এঞ্জো ফার্নান্দেজের জয়ে সম্পূর্ণ হল অসম্ভব এক প্রত্যাবর্তন। বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে ৭৫ মিনিটের পর দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও জয়ের এমন নজির আগে দেখা যায়নি। মেসি ম্যাচ শেষে হাউহাউ করে কাঁদলেন। অবশ্য কোনও নাটকীয় কথা বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে এমনটা হতেই পারে।’ এটাই তাঁর স্বভাব। যত বড় কীর্তিই হোক, তিনি তাকে কখনও নিজের মহিমার বিজ্ঞাপন বানান না।
সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা অবশ্য এসেছিল ম্যাচ শেষে। জকোভিচ যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি, তখন উঠে এল মেসির প্রসঙ্গ। সার্বিয়ান তারকা হেসে বলেন, ‘মেসির মতো যদি আমাকে ৯০ মিনিট খেললেই চলত!’ ক্লান্ত শরীরেও তাঁর সেই রসিকতা যেন দুই কিংবদন্তির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধারই আরেকটি ছবি। এই দুই গল্পের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে। জকোভিচের শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তি ক্লান্ত হয়নি। মেসির পেনাল্টি ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ব্যর্থ হয়নি। দু’জনেই জানতেন, বয়স বাড়ছে। প্রতিপক্ষ তরুণ হচ্ছে। শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না। তবুও তাঁরা প্রতিদিন মাঠে নামেন। কারণ তাঁরা শুধু ম্যাচ জেতেন না, মানুষের বিশ্বাসও জিতিয়ে দেন।
অনেকে ভেবেছিলেন তাঁদের গল্প শেষ। নতুন প্রজন্ম এসে জায়গা নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কিংবদন্তিরা শেষ অধ্যায় লেখেন নিজেরাই। আর সেই অধ্যায় অনেক সময়ই আগের সব অধ্যায়ের চেয়েও সুন্দর হয়। সেদিন কেউ অলৌকিক কিছু দাবি করেনি। তবুও তাঁরা অলৌকিক মুহূর্ত উপহার দিলেন। একজন র্যাকেট হাতে, অন্যজন ফুটবল পায়ে। কিন্তু দু’জনের বার্তাই ছিল এক, স্বপ্ন দেখার কোনও বয়স হয় না। লড়াই থামিয়ে দেওয়ারও কোনও বয়স হয় না। স্কোরলাইন একদিন হারিয়ে যাবে। পরিসংখ্যানও হয়তো নতুন কেউ ভেঙে দেবে। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সে একই দিনে পৃথিবীর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেসি ও জকোভিচ যে প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন, তা শুধু ক্রীড়া ইতিহাসে নয়, মানুষের হৃদয়েও বেঁচে থাকবে। কারণ, কিংবদন্তিরা ট্রফি জিতে অমর হন না। তাঁরা অমর হন সেইসব মুহূর্তে, যখন সবাই ভাবে সব শেষ, আর ঠিক তখনই তাঁরা আবার উঠে দাঁড়ান।ঘুরে দাঁড়ান।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *