সবচেয়ে বড় মঞ্চে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মেসি! আর ৯০ মিনিট সামনেই অমরত্বের দুয়ার
যদি ফুটবলেরও কোনো কবিতা থাকে, তবে তার সবচেয়ে সুন্দর পঙ্ক্তিগুলোর নাম লিওনেল মেসি। বয়স তাঁকে থামাতে পারেনি, সময় তাঁকে ম্লান করতে পারেনি। বরং প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন তাঁর গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। সেই গল্পের শেষ অধ্যায়টি এখন আর দূরে নয়। আর মাত্র একটা ম্যাচ। আর মাত্র একটা জয়। তারপরই হয়তো ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সমাপ্তিগুলোর একটা লিখে ফেলবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপের চতুর্থ ট্রফি থেকে এখন মাত্র ৯০ মিনিট দূরে আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির দল টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে। আর অধিনায়ক মেসি খেলতে যাচ্ছেন নিজের কেরিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১৪ সালে স্বপ্নভঙ্গ, ২০২২ সালে স্বপ্নপূরণ—এবার ২০২৬-এ সেই গল্পকে আরও মহিমান্বিত করার সুযোগ।
আগামী রোববার নিউ জার্সিতে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। মাঠে নামলেই মেসি ছুঁয়ে ফেলবেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুকে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তিনটি ফাইনাল খেলা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হবেন তিনি। তবে কাফুর মতো টানা তিনটি ফাইনাল নয়, চারটি বিশ্বকাপ জুড়ে তিনটি ফাইনালে পৌঁছানোর কীর্তিই আলাদা করে জায়গা করে দেবে মেসিকে।
২০১৪ সালে মারাকানায় অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হার ছিল তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। চোখের সামনে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল। সেই আক্ষেপ বুকে নিয়েই আট বছর পর কাতারে ফিরেছিলেন। সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু হলেও এরপর যেন অন্য এক মেসিকে দেখেছিল বিশ্ব। একের পর এক জাদুকরী পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ট্রফি এনে দিয়ে পূরণ করেছিলেন আজীবনের স্বপ্ন।

চার বছর পরও গল্পটা থামেনি। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার হৃদস্পন্দন। চলতি বিশ্বকাপে এরমধ্যে আট গোল করেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নিজে গোল না করলেও দুটি অ্যাসিস্ট করে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাঁর মোট অ্যাসিস্ট এখন ১২টি, যার ১০টিই এসেছে নকআউট পর্বে। ১৯৬৬ সালের পর এত বেশি বিশ্বকাপ অ্যাসিস্ট আর কোনো ফুটবলারের নেই। সবচেয়ে বড় মঞ্চেই যে তিনি সবচেয়ে উজ্জ্বল, এই পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
শুধু তাই নয়, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। এটা তাঁর কেরিয়ারের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ধারাবাহিকতা। ফাইনালেও যদি গোল করেন বা করান, তবে ছুঁয়ে ফেলবেন নিজেরই সর্বকালের সেরা রেকর্ড।
ব্যক্তিগত আরেকটা লড়াইও চলছে তাঁর। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে সমান আট গোল থাকলেও চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে এগিয়ে আছেন মেসি। অর্থাৎ, ফাইনালে তাঁর প্রতিটি স্পর্শই বদলে দিতে পারে একাধিক ইতিহাস।
ইংল্যান্ডকে হারানোর পর মেসির গলাতেও ছিল আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা। তাঁর কথায়, “মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, আমরাই বিশ্বের সেরা।” কথাটি অহংকার নয়, বরং গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রতিফলন। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, আবার বিশ্বকাপের ফাইনাল—এই আর্জেন্টিনা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বারবার প্রমাণ করেছে।
এখন সামনে শেষ পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ স্পেন। বাধা কঠিন, কিন্তু মেসির গল্প তো কখনও সহজ পথে লেখা হয়নি। আর একবার যদি আকাশ ছুঁতে পারেন, তবে শুধু আরেকটা ট্রফি নয়, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মহাকাব্যগুলোর একটির শেষ পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবেন লিওনেল মেসি।
