মেসির জাদুতে সাত মিনিটের ঝড়, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
রূপকথার গল্পে শেষ অধ্যায় লেখেন নায়ক। লিওনেল মেসি যেন এখনও সেই গল্পই লিখে চলেছেন। বয়স ৩৯ ছুঁয়েছে, তবু ম্যাচের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে বলটা যখন তাঁর পায়ে আসে, তখনও কোটি মানুষের বিশ্বাস জেগে ওঠে—কিছু একটা হবেই। সেই বিশ্বাসই আবার সত্যি হলো আটলান্টায়। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও সাত মিনিটের দুরন্ত ঝড়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা।
আটলান্টা স্টেডিয়ামে তখন ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ ধ্বনি ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল। ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফেরার স্বপ্ন প্রায় ছুঁয়েই ফেলেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, শেষ বাঁশি বাজার আগে মেসির আর্জেন্টিনাকে কখনও শেষ বলে ধরে নেওয়া যায় না।
প্রথমার্ধ ছিল রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের। সুন্দর ফুটবলের চেয়ে শারীরিক সংঘর্ষ, ফাউল আর উত্তেজনাই বেশি চোখে পড়েছে। দুই দলই ঝুঁকি নেয়নি। ফলে গোলের সুযোগও ছিল হাতে গোনা। বিরতিতে স্কোরলাইন ছিল গোলশূন্য।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ইংল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে মরগান রজার্সের নিখুঁত ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ব্রিটিশদের এগিয়ে দেন। এরপর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালালেও দুর্দান্ত সব সেভে দলকে বাঁচিয়ে রাখছিলেন জর্ডান পিকফোর্ড। সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল, আর ইংল্যান্ডের ফাইনালের স্বপ্ন যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছিল।
কিন্তু এই আর্জেন্টিনা গত কয়েক বছরে শিখেছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারাতে নেই। আর সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু তো একজনই—লিওনেল মেসি।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে কর্নার থেকে সবাই যখন ক্রসের অপেক্ষায়, তখন মেসি দেখালেন তাঁর ফুটবল মস্তিষ্ক। বল বাড়ালেন বক্সের বাইরে থাকা এনসো ফার্নান্দেজের কাছে। প্রথমবারেই জোরালো শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে সমতা ফেরান এনসো। সেই গোলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।
ইংল্যান্ড তখনও ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবারও মেসির জাদু। ডান দিক থেকে তাঁর নিখুঁত ভাসানো ক্রসে উড়ে এসে হেডে জাল কাঁপান বদলি নামা লাউতারো মার্তিনেস। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড, আর বিস্ফোরিত হয় আর্জেন্টাইন গ্যালারি।

শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নীল-সাদা উল্লাস। সতীর্থদের সঙ্গে গ্যালারির সামনে গিয়ে নাচলেন, গান গাইলেন মেসিরা। এই জয় শুধু আরেকটি জয় নয়, এটা বিশ্বাসের জয়, হার না মানা মানসিকতার জয়, আর এক কিংবদন্তির স্পর্শে লেখা আরেকটি অবিশ্বাস্য অধ্যায়।

পুরো ম্যাচে গোল না করেও আর্জেন্টিনার দুই গোলের নেপথ্যে ছিলেন মেসিই। বয়স যত বাড়ছে, ততই যেন নিজের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছেন তিনি। গোল করাই তাঁর একমাত্র কাজ নয়, সবচেয়ে কঠিন সময়ে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেওয়াই যেন তাঁর পরিচয়।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার অপরাজিত থাকার রেকর্ডও অক্ষুণ্ণ থাকল। এবার সামনে শেষ পরীক্ষা। ১৯ জুলাই নিউজার্সিতে ট্রফির মঞ্চে প্রতিপক্ষ স্পেন। আর মেসির সামনে সুযোগ, আরেকটি মহাকাব্য লিখে নিজের কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার।

