তেরঙা আজকের মতো ছিল না! ১৯০৬ থেকে ১৯৪৭- কীভাবে বদলে গেল ভারতের পতাকা?

0



স্বাধীনতা দিবস এলেই চারদিকে উড়তে দেখা যায় তেরঙা। গৈরিক, সাদা ও সবুজের মাঝে নীল অশোকচক্র- এই ছবিটাই আজ ভারতের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু জানেন কি, এই পতাকা একদিনে তৈরি হয়নি? স্বাধীনতার আগে একাধিকবার বদলেছে ভারতের জাতীয় পতাকার নকশা, রং এবং প্রতীক। প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি করে অধ্যায়।
ভারতের জাতীয় পতাকার বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯০৬ সালে। কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে সেই সময় যে পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল, তার সঙ্গে আজকের তেরঙার মিল ছিল সামান্যই। তিনটি অনুভূমিক রঙের অংশে তৈরি সেই পতাকায় ছিল পদ্মফুল, ‘বন্দে মাতরম্’ লেখা এবং সূর্য ও অর্ধচন্দ্রের প্রতীক। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের আবহে এই পতাকা হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক।
এর পর ১৯০৭। ভারতের স্বাধীনতার দাবি দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছল বিদেশের মাটিতে। মাদাম ভিকাজি কামা জার্মানির স্টুটগার্টে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে একটি ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তিন রঙের সেই পতাকায় ছিল ‘বন্দে মাতরম্’, সূর্য, অর্ধচন্দ্র এবং সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রতীক। দেশের বাইরে ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের এই ঘটনা স্বাধীনতার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। পতাকার বিবর্তন থেমে থাকেনি। ১৯১৭ সালে হোম রুল আন্দোলনের সময় অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে যুক্ত পতাকায় দেখা গেল লাল ও সবুজের একাধিক স্ট্রাইপ। তার সঙ্গে সপ্তর্ষির সাতটি তারা, চাঁদ এবং ইউনিয়ন জ্যাকও ছিল। ভারতের স্বশাসনের দাবিই ছিল এই পতাকার মূল বার্তা।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের পথে এগোল পতাকা ১৯২১ সালে। বিজয়ওয়াড়ায় কংগ্রেসের বৈঠকে পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া একটি পতাকার নকশা নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর কাছে যান। প্রাথমিক নকশায় ছিল লাল ও সবুজ। পরে গান্ধীর পরামর্শে যুক্ত হয় সাদা রং ও চরকা। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে এই পতাকা দ্রুত জড়িয়ে পড়ে। চরকা হয়ে ওঠে স্বদেশি, আত্মনির্ভরতা এবং স্বাধীনতার প্রতীকের অন্যতম মুখ। তারপর ১৯৩১। বর্তমান তেরঙার সবচেয়ে কাছাকাছি যে পতাকাটি প্রথম দেখা যায়, সেটি সেই সময়ের। গৈরিক, সাদা ও সবুজ—এই তিন রং সমান অংশে সাজানো হয় এবং মাঝখানে থাকে চরকা। এই পতাকাকেই বর্তমান জাতীয় পতাকার সরাসরি পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়।
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন-২২ জুলাই, ১৯৪৭। স্বাধীনতার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে গণপরিষদ স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে বর্তমান তেরঙাকে অনুমোদন করে। গৈরিক, সাদা ও সবুজ রং থাকল আগের মতোই। শুধু মাঝখানের চরকার জায়গা নিল সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র। নীল রঙের সেই অশোকচক্রে রয়েছে ২৪টি কাঁটা বা স্পোক। আজ যে পতাকা আমরা দেখি, তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ৩:২। উপরে গৈরিক, মাঝে সাদা এবং নীচে গাঢ় সবুজ। সাদা অংশের কেন্দ্রে নীল অশোকচক্র। এই পতাকাই স্বাধীন ভারতের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তাই স্বাধীনতা দিবসে যখন আকাশে তেরঙা উড়তে দেখি, তা শুধু তিনটি রং আর একটি চক্রের ছবি নয়। তার প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু বছরের পথচলা। কখনও পদ্ম, কখনও সূর্য-চাঁদ, কখনও চরকা- শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ যাত্রার পর মাঝখানে জায়গা করে নিয়েছে অশোকচক্র। আজকের তেরঙা তাই শুধু একটি পতাকা নয়। এটি বদলে যাওয়া ভারতের ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল-স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রার প্রতীক।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *