নেপালে নিখোঁজ বাংলার পর্যটকরা কোথায়, উত্তর নেই। দেশে ফিরছে শুধু তাঁদের লাগেজ- ব্যাগ

0


তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। কেউ ভাবেননি, সেই যাত্রার পর একদিন তাঁদের খোঁজেই পথে নামতে হবে পরিবারকে। কেউ ভাবেননি, প্রিয় মানুষটির অপেক্ষায় দিনের পর দিন কেটে যাবে। অথচ আজ বাংলার একাধিক পরিবার সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের পর চলো যাই ট্রাভেল সংস্থার নিখোঁজ ৩২ জন পর্যটকের এতদিন পরেও কোনও নিশ্চিত খবর এখনও নেই। ফিরছেন না মানুষগুলো, দেশে ফিরছে শুধু তাঁদের ফেলে যাওয়া লাগেজ- যেন প্রতিটি ব্যাগের ভিতর লুকিয়ে রয়েছে এক একটি পরিবারের কান্না।
গত ২৬ আগস্টের পর থেকে নেপালে নিখোঁজ রাজ্যের এক ট্রাভেল সংস্থার ৩২ জন পর্যটক। সবাই ‘চলো যাই’ ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিল দলটি। বেশ চলছিল। তারপরই যেন সবকিছু থমকে যায়। সবকিছু নিস্তব্ধ। ফোনের ওপারে আর কোনও কণ্ঠস্বর নেই। কোনও যোগাযোগ নেই। বাড়ির মানুষগুলোর কাছে শুধু অপেক্ষা- যদি হঠাৎ কোনও দিন ফোনটা বেজে ওঠে, যদি ওপার থেকে ভেসে আসে পরিচিত সেই গলা।
পরিবারের সেই অপেক্ষার মধ্যেই এবার দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে নিখোঁজদের ফেলে যাওয়া মালপত্র। নেপালের হোটেলে পড়ে থাকা ব্যাগ, পোশাক এবং অন্যান্য সামগ্রী ভারতে ফেরাতে নেপালের শুল্ক দফতরকে চিঠি দিয়েছে কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস। ৩২ জনের মোট ১৯টি লাগেজ আইনি প্রক্রিয়া মেনে কলকাতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঠমান্ডু থেকে রক্সৌল, বারাউনি, গোবিন্দঘাট হয়ে রাজ্যে পৌঁছবে সেই সামগ্রী।

কিন্তু পরিবারের কাছে এগুলি আর নিছক ব্যাগ বা পোশাক নয়। যে জামাটি পরেছিলেন প্রিয় মানুষটি, যে ব্যাগে নিজের হাতে গুছিয়ে রেখেছিলেন প্রয়োজনীয় জিনিস, যে পোশাক পরে হয়তো শেষ বার বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন-আজ সেই সবকিছুই হয়ে উঠছে অমূল্য স্মৃতি। মানুষটি নেই, অথচ তাঁর ছোঁয়া লেগে থাকা জিনিসগুলো ফিরছে বাড়িতে। সেই ফেরা আনন্দের নয়, বরং বুকের ভিতর জমে থাকা এক অসহ্য শূন্যতার।
নিখোঁজদের সন্ধানে ইতিমধ্যেই নেপালে ছুটে গিয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অনেকে। হাসপাতাল, থানা, ভারতীয় দূতাবাস থেকে দুর্ঘটনাস্থল—সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ চালিয়েছেন তাঁরা। তবু এখনও মেলেনি নিশ্চিত খবর। নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজও চলছে। যাঁরা নেপালে যেতে পারেননি, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নমুনা সরকারি উদ্যোগে সংগ্রহ করে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এই নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন মুকুল রায়ের পুত্র শুভ্রাংশু রায়ের স্ত্রী শর্মিষ্ঠা রায়ও। তিনিও ‘চলো যাই’-এর ওই দলে একা মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর তাঁরও কোনও সন্ধান মেলেনি।
২৬ অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ল্যাংট্যাং এলাকায় হিমবাহের একাংশ ভেঙে পড়ার পর হিমবাহের জল ও কাদামাটির প্রবল স্রোত নেমে আসে। লেন্দে খোলা, ভোটেকোশী এবং ত্রিশুলী নদীর অববাহিকা ধরে সেই স্রোত আছড়ে পড়ে জনপদ, রাস্তা ও সেতুর উপর। মুহূর্তে বদলে যায় অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ।
আজ তাই বাংলার বহু বাড়িতে প্রার্থনার সঙ্গে মিশে আছে কান্না। ফোনটা বেজে উঠবে—এই আশায় কেউ এখনও অপেক্ষা করছেন। দরজা খুলে প্রিয় মানুষটি দাঁড়াবেন—এই অসম্ভব আশাটুকুও হয়তো কেউ ছাড়তে পারছেন না। আর তারই মাঝে দেশে ফিরছে ১৯টি লাগেজ।
মানুষগুলো ফিরছেন না। ফিরছে তাঁদের শেষ স্মৃতি। আর সেই ব্যাগ খুললেই হয়তো কোনও মায়ের চোখে জল আসবে, কোনও স্ত্রীর বুকটা হাহাকার করে উঠবে, কোনও সন্তানের মনে পড়বে-এই পোশাকটা তো বাবা পরেই বেরিয়েছিলেন। স্মৃতি ফিরবে, অপেক্ষা থেকে যাবে। ছবি এক্স হ্যান্ডল থেকে সংগৃহীত (Image collected from X handle)

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *