‘মর্জিনা’ থেকে ‘নীপা’, বাঙালির মনে মায়া ছড়িয়ে চিরআড়ালে মিঠু মুখোপাধ্যায়

0



একসময় ‘মর্জিনা’ হয়ে মাতিয়েছিলেন দর্শককে, ‘মৌচাক’-এর নীপা হয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন অগণিত বাঙালির মনে। রুপোলি পর্দার সেই মিষ্টি মুখ, সাবলীল অভিনয় আর চেনা মায়া আজ সবই স্মৃতি। উত্তম-সৌমিত্রদের সময়ের বাংলা ছবির পরিচিত মুখ মিঠু মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন চিরআড়ালে। প্রয়াত বাংলা সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়। রবিবার রাতে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রায় এক বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ হল তাঁর জীবনযাত্রা।

রুপোলি পর্দায় একসময় তাঁর উপস্থিতিই ছিল আলাদা আকর্ষণ। মিষ্টি মুখ, গ্ল্যামারাস উপস্থিতি আর সাবলীল অভিনয়ে ৭০ ও ৮০-এর দশকের বাংলা ছবির দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, দীপঙ্কর দে-সহ সেই সময়ের একাধিক তারকার সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ও ওড়িয়া ছবিতেও অভিনয় করেছেন। দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও দর্শকের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল তাঁর একাধিক চরিত্র।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৭২ সালে চিত্ত বসু পরিচালিত ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে রুপোলি পর্দায় পা রাখেন মিঠু। প্রথম ছবিতে সেভাবে পরিচিতি না পেলেও পরের ছবিতেই বদলে যায় গল্প। দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘মর্জিনা আবদুল্লা’ হয়ে ওঠে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ১৯৭৩ সালের সেই ছবিতে মর্জিনা চরিত্রে তাঁর অভিনয়, নাচ এবং পর্দার উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিচিত হয়ে ওঠেন বাংলা ছবির জনপ্রিয় মুখ হিসেবে।

এরপর একের পর এক ছবিতে নিজেকে প্রমাণ করতে থাকেন মিঠু। ১৯৭৩-এর ‘নিশিকন্যা’-য় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করার পর ১৯৭৪ সালে আসে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’। উত্তম কুমার ও রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে অভিনীত এই ছবিতে নীপা চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও বাংলা সিনেমার দর্শকের কাছে স্মরণীয়। ছবিটির জনপ্রিয়তা তাঁর তারকাখ্যাতিকে আরও মজবুত করে।

‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’, ‘সন্ধি’-র মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় দর্শকের নজর কেড়েছিল। সেই সময়ের বাংলা বাণিজ্যিক ছবির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। বাংলায় সাফল্যের পর হিন্দি ছবির জগতেও পা রাখেন তিনি। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহ পরিচালিত ‘খান দোস্ত’-এর মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘সফেদ ঝুট’, ‘দিল্লাগি’, ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেন।

বাংলার পাশাপাশি আঞ্চলিক ছবিতেও নিজের অভিনয়ের পরিধি বাড়িয়েছিলেন মিঠু। ১৯৮২ সালে ওড়িয়া ছবি ‘জ্বাইন পুয়া’-য় উত্তম মহান্তির বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি তাঁর জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মৌচাক’-এর ওড়িয়া রিমেক ছিল।

তবে কেরিয়ারের মাঝপথেই ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন মিঠু। ১৯৮৪ সালে ‘প্রার্থনা’ ছবিতে অতিথি চরিত্রে দেখা গেলেও এরপর আর নিয়মিত অভিনয় করেননি। নিজের প্রযোজনায় ‘রাঙা ভাঙা চাঁদ’ নামে একটি ছবি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিভা বসুর উপন্যাস অবলম্বনে দীনেন গুপ্তের পরিচালনায় ছবিটির শুটিং শুরু হলেও তা মাঝপথে থেমে যায়। কয়েক বছর পর পরিচালক চন্দ্র বারোটের হাত ধরে ছবিটি নতুনভাবে রূপ পায় এবং ১৯৯০ সালে ‘আশ্রিতা’ নামে মুক্তি পায়। ছবিটিই হয়ে ওঠে মিঠুর শেষ অভিনীত ছবি।

এরপরের জীবনটা কেটেছে অনেকটাই নিভৃতে। বহু বছর ধরে মুম্বইতেই থাকতেন মিঠু। অভিনয় থেকে দূরে সরে গিয়ে জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতিও ক্রমশ কমে যায়। একসময় বাংলা ছবির দর্শকের পরিচিত মুখ থাকলেও জীবনের শেষ পর্বে অনেকটাই আড়ালে ছিলেন তিনি।

গত প্রায় এক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন অভিনেত্রী। মুম্বইতেই চলছিল তাঁর চিকিৎসা। শেষ পর্যন্ত রবিবার রাতে সেখানকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।

‘আশ্রিতা’-কেই শেষ ছবি করে রুপোলি পর্দা থেকে সরে যান মিঠু। এরপর আর ক্যামেরার সামনে ফেরেননি। কিন্তু সিনেমা থেকে দূরে থাকা মানেই দর্শকের মন থেকে মুছে যাওয়া নয়। ‘মর্জিনা আবদাল্লা’র প্রাণবন্ত মর্জিনা, ‘মৌচাক’-এর নীপা কিংবা ‘আশ্রিতা’র স্মৃতি—তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি বাংলা সিনেমার দর্শকের মনে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *