‘মর গয়া তো কৌন-সি বড়ি বাত হ্যা!’, নানার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ অনুপম খের থেকে শচীন- বিরাটের
“আ গয়ে মেরি মওত কা তামাশা দেখনে ?” পর্দায় তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত এই সংলাপ একসময় সাড়া ফেলেছিল দর্শক মনে। অথচ আজ সেই সংলাপই যেন ফিরে আসছে এক নির্মম বাস্তবতার সামনে। যে কণ্ঠে ছিল তীব্রতা, চোখের অভিব্যক্তিতে ছিল হাজার অনুভূতি, অভিনয়ে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা সেই কণ্ঠ আজ চিরতরে স্তব্ধ। ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন নানা পাটেকর। গোয়ার বাড়িতে অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ ৪৫ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পরও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় সিনেমার এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান হল।

নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিনোদন জগতের পাশাপাশি ক্রিকেট মহলেও। তাঁর প্রয়াণে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে বলি অভিনেতা সুনীল শেট্টি লেখেন,”একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছি না! তোমার মতো মানুষ আজকাল আর তৈরি হয় না। যত উচ্চতাতেই পৌঁছেছ, তবুও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সবসময় গভীরভাবে যুক্ত থেকেছ। নিজের মতো করে বেঁচেছ, সত্যি কথা বলতে কখনও পিছপা হওনি এবং নিজের কাজের প্রতি ছিল তোমার অসীম নিষ্ঠা।নানা ছিলেন এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর মতো আর কেউ কখনও আসবেন না। শান্তিতে থেকো, ভাই… তোমাকে ছাড়া সিনেমা আর আগের মতো থাকবে না।”

প্রিয় বন্ধু নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ অনুপম খের। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক আবেগঘন ভিডিয়ো বার্তায় নানাকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা অভিনেতা এবং সেরা মানুষ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন,”কাজ শেষ করে সবে দর্শকের সামনে কার্টেন কল সেরেছি। মঞ্চের নেপথ্যে যেতেই পরিচালক গজেন্দ্র বললেন, নানা আর নেই।” এরপরও পেশাগত দায়িত্ব সামলে মানুষের সঙ্গে দেখা করা, ছবি তোলা, হাসিমুখে থাকা, এমনকী খেতেও বসতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না বন্ধুর চলে যাওয়া। নানার স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে অনুপম বলেন, ” ওকে যতটা চিনতাম, তাতে মনে হয়, শ্রদ্ধার্ঘ্যের কথা শুনেই নানা হয়তো বলত, ‘আরে, তো ক্যা হো গয়া? মর গয়া তো কৌন-সি বড়ি বাত হ্যায়? সব মরতে হ্যায়!” বন্ধুর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলিও মনে পড়ছে অনুপমের। অনুপম বলেন,” আমি তোমাকে মিস করব, আমার বন্ধু। তোমার উষ্ণতা, তোমার আলিঙ্গন, তোমার অসাধারণ অভিনয় সবকিছুই মিস করব। যখনই তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করবে, তোমার ছবিগুলো দেখব। যদিও আজ শুধু ইচ্ছে করছে, আরও একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম।”

নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকাহত অক্ষয় কুমার।এক আবেগঘন বার্তায় অভিনেতা লেখেন,”নানা জি-র প্রয়াণের খবর শুনে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি ছিলেন এমন এক বিরল অভিনেতা, যাঁকে দর্শকের নজর কাড়তে কখনও অতিরিক্ত কিছু করতে হত না। তাঁর কণ্ঠ, অভিনয়ের তীব্রতা এবং প্রতিটি পারফরম্যান্সে ফুটে ওঠা সততা তাঁকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছিল।” নানা পাটেকরের সঙ্গে ‘ওয়েলকাম’ এবং ‘হাউসফুল ৫’-এ কাজের স্মৃতিও ভাগ করে নেন অক্ষয়। তিনি লেখেন,” তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। সেই সমস্ত শুটিং সেটের স্মৃতি আমি সবসময় হৃদয়ের কাছে রাখব। নানা জি সত্যিই ছিলেন একেবারে অনন্য। এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে আপনি আর আমাদের মধ্যে নেই। সমস্ত স্মৃতির জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে কতটা মিস করব, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”

নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রজনীকান্তও। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করতে পারছেন না বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করেন দক্ষিণী সুপারস্টার। তিনি লেখেন,”আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার প্রিয় বন্ধু নানাজি আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”রজনীকান্ত ও নানা পাটেকর একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন ২০১৮ সালের ছবি ‘কালা’-তে ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় নানা পাটেকর, ঈশ্বরী রাও, হুমা কুরেশি,পঙ্কজ ত্রিপাঠী, অঞ্জলি পাতিল-সহ একাধিক অভিনেতাকে।
ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন তেন্ডুলকরও নানার প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন। সমাজমাধ্যমে নানাকে স্মরণ করে তিনি লেখেন, “আমি নানাকে অত্যন্ত সরল ও মাটির মানুষ হিসেবেই মনে রাখব। তাঁর কাজের মধ্যেও সেই একই সততা ফুটে উঠত। মারাঠি হোক বা হিন্দি, যে চরিত্রেই অভিনয় করেছেন, তাতেই একেবারে বাস্তব অনুভূতি এনে দিতেন তিনি।” নানার প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করে শচীন আরও লেখেন, “তাঁর চলে যাওয়ার খবর শুনে অত্যন্ত দুঃখিত। তাঁর পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। ওম শান্তি।”
নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলিও। অভিনেতাকে স্মরণ করে তিনি লেখেন,”ভারতীয় সিনেমার এক সত্যিকারের কিংবদন্তি ছিলেন নানা পাটেকর। তাঁর কাজ এবং তাঁর রেখে যাওয়া অনন্য উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবে। নানাজির আত্মার শান্তি কামনা করি। ওঁ শান্তি।”
১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম নানা পাটেকরের। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন তিনি। এরপর হিন্দি ও মারাঠি দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ‘সালাম বম্বে’, ‘পরিন্দা’,সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ২০১৩ সালে ভারতীয় সিনেমা ও শিল্পে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। তবে শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না নানা পাটেকরের জীবন। ১৯৮৮ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে আর্মি থেকে অবসর নেন।ব্যক্তিগত জীবনেও নিজের নীতিতে অটল ছিলেন নানা। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সিনেমা হারাল এক শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র অভিনেতাকে।

