চার গোলের হারেও জাগল নতুন স্বপ্ন, যুবভারতীতে ব্রাজিলের রাতে ভারতকে কুর্নিশ

0



কখনও কখনও স্কোরলাইন ম্যাচের পুরো গল্পটা বলে না। শনিবার যুবভারতীর রাতটাও তেমনই। ইতিহাসের পাতায় ফলটা লেখা থাকবে- ভারত ০, ব্রাজিল ৪। কিন্তু সেই চার গোলের আড়ালে ছিল অন্য এক ভারত। যে দল বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল শক্তির সামনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছে, কয়েক মুহূর্তে ব্রাজিলকে চাপে ফেলেছে, গোলের সুযোগ তৈরি করেছে এবং ৪৯ বছর আগের কলকাতার সেই স্মৃতিকেও যেন নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে। পেলের কসমসকে যে শহর একদিন আটকে দিয়েছিল, সেই কলকাতাতেই শনিবার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলল ভারত।
১৯৭৭ সালে পেলের কসমসের সঙ্গে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক ম্যাচ আজও কলকাতার ফুটবল-স্মৃতির অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। সেই রাতের আবেগ বুকে নিয়েই এ দিন যুবভারতীতে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ৪৫ হাজার দর্শক। গ্যালারিজুড়ে হলুদ-সবুজের ঢেউ, ব্রাজিলের পতাকা, ভারতের জার্সি- সব মিলিয়ে ম্যাচ শুরুর আগেই বোঝা গিয়েছিল, এটি শুধুই একটি প্রীতি ম্যাচ নয়। কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটা ছিল এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি।


খেলা দেখতে যুবভারতীতে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী-সহ বিশিষ্ট অতিথিরা। গ্যালারিতে ছিলেন প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রীড়াবিদ, বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ এবং হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী। মাঠের বাইরে উৎসব, মাঠের ভিতরে বিশ্বমানের ফুটবলের পরীক্ষা। একদিকে ফিফা ক্রমতালিকায় অনেক এগিয়ে থাকা ব্রাজিল, অন্যদিকে ভারত। ব্যবধানটা কাগজে-কলমে বিশাল। কিন্তু ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই সেই ব্যবধানটাকে অন্তত মাঠে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছে খালিদ জামিলের দল।
শুরুতেই ভারতের সাহসী মনোভাব নজর কেড়েছিল। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রক্ষণে মার্কুইনহোসদের মতো তারকা। তাঁদের সামলানোর দায়িত্ব ভারতের। তবু সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে উঠেছে ভারত। মানভীর সিং, রায়ান উইলিয়ামসরা কয়েক বার ব্রাজিলের রক্ষণে অস্বস্তি তৈরি করেছেন। ম্যাচের প্রথম দিকেই ভারতের কর্নার আদায় করে নেওয়া কিংবা বক্সের কাছে পৌঁছে যাওয়ার দৃশ্য গ্যালারিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল-শুধু রক্ষণাত্মক হয়ে থাকতে আসেনি ভারত। প্রায় আধঘণ্টা পর্যন্ত ব্রাজিলকে গোলের বাইরে রাখা নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য বড় প্রাপ্তি। কিন্তু ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছোট ভুলেরও মূল্য বড়। ২৮ মিনিটে এস্তেভাওয়ের শট গুরপ্রীত সিং সান্ধুর হাত ফসকে জালে জড়িয়ে যায়। সেখান থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ব্রাজিলের হাতে চলে যায়। বিরতির আগে পেদ্রোর গোলে ব্যবধান ২-০।


দুই গোল পিছিয়ে থেকেও ভারত দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে। রায়ান ও মানভীরের পরপর আক্রমণে ব্রাজিলের গোলরক্ষককে ব্যস্ত হতে হয়। বিশেষ করে রায়ানের শট এবং পরে তাঁর আরও একটি প্রচেষ্টা গোলের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছিল ভারতকে। ৩-০ হয়ে যাওয়ার পরেও হাল ছাড়েনি দল। গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে ভারতকে বঞ্চিত করে ব্রাজিল। আরও একটি সুযোগে রায়ানের শট অল্পের জন্য বাইরে যায়। শেষদিকে স্যামুয়েল লিনোর দ্বিতীয় গোল ব্রাজিলের জয়কে ৪-০ করে দেয়। ব্যবধানটা তখন বড়। কিন্তু তার আগেই ভারত দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের সেরা দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা রয়েছে। গোলের সুযোগ তৈরি করা, আক্রমণে উঠে যাওয়া এবং একাধিকবার ব্রাজিলের রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলা-এই রাত থেকে ভারতীয় ফুটবলের জন্য পাওয়ার মতো কিছু মুহূর্তও থাকল। হ্যাঁ, চার গোলের হার। হ্যাঁ, ব্রাজিলের জয়ের ব্যবধানটা বড়। কিন্তু এই ম্যাচকে শুধু চার গোলের হার হিসেবে দেখলে যুবভারতীর রাতটার আবেগটা ধরা যাবে না। ১৯৭৭-এ পেলের কসমসকে আটকে দিয়েছিল মোহনবাগান। ৪৯ বছর পর সেই একই শহরে ব্রাজিলের মতো ফুটবল-পরাশক্তির সামনে নামল ভারত। ফল বদলানো গেল না, ইতিহাসও নতুন করে লেখা হল না। কিন্তু কলকাতা আবার দেখল বিশ্বফুটবলের মহাতারকাদের, আর ভারতীয় ফুটবলাররাও পেলেন নিজেদের সীমা বোঝার পাশাপাশি সেই সীমা পেরনোর স্বপ্ন দেখার সুযোগ। শেষ বাঁশির পর ব্রাজিলীয় তারকাদের সঙ্গে ভারতীয় ফুটবলারদের করমর্দন, ছবি তোলা-সেই দৃশ্যটাও থেকে গেল রাতের স্মৃতিতে। ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে ভারতীয় ফুটবলারদের হাসিমুখে ছবি যেন বলে দিল, এই রাত শুধু স্কোরলাইনের নয়। কলকাতার জন্য এটি ছিল বহু প্রতীক্ষিত এক ফুটবল-উৎসব। চার গোলের ব্যবধানে ব্রাজিল জিতেছে ঠিকই, কিন্তু যুবভারতী ছেড়ে বেরনোর সময় ভারতীয় সমর্থকদের মনে থেকে গেল অন্য এক অনুভূতি-বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে একই মাঠে দাঁড়িয়ে লড়াই করার স্বপ্নটা অন্তত এক রাতের জন্য বাস্তব হয়েছিল। ছবি সৌজন্যে এআইএফএফ

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *