‘প্রাণ যায় যাক, গান থেকে যাবে’, ঘামের গন্ধ ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের পর চাকরি হারিয়েও শোভনের উপলব্ধি
একসময় গান শেখানো ও শিক্ষকতাই ছিল শোভন চক্রবর্তীর পেশা। ছাত্রছাত্রীদের রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাতেন, স্বপ্ন ছিল বড় মঞ্চে গান গাওয়ার। কিন্তু সংসারের টানে সেই মানুষকেই বেছে নিতে হয়েছিল নিরাপত্তারক্ষীর কাজ। কিন্তু সেই কাজের ফাঁকে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ও তাঁর গায়ের ঘামের গন্ধই একদিন তাঁর চাকরি হারানোর কারণ হয়ে ওঠে।
গান শেখানো আর পড়ানো দুটোকেই তিনি দেখতেন ভালবাসার জায়গা থেকে। কিন্তু ২০২০ সালে অতিমারি এসে তাঁর সেই জীবনটাকেই ওলটপালট করে দেয়। একে একে কমতে থাকে ছাত্রছাত্রী, বন্ধ হয়ে যায় গান শেখানোর পথ। শিক্ষকতার উপর নির্ভর করেই কোনওরকমে চলছিল সংসার। পরিস্থিতি সামলাতে ২০২২ সালে বাধ্য হয়ে অন্য কাজের সন্ধান করতে হয় তাঁকে।পরিচিত এক সুপারভাইজরের সূত্রে শুরু হয় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ। হাতে গানের খাতা নেই, সামনে ছাত্রছাত্রীও নেই। কিন্তু গানকে কীভাবে ছাড়বেন শোভন? তাই ডিউটির ফাঁকে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক পরেই গাইতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত।
সেই গানই একদিন ক্যামেরাবন্দি হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ভিডিয়ো। নিরাপত্তারক্ষীর পোশাকে শোভনের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে মুগ্ধ হন অসংখ্য মানুষ। মুহূর্তেই নতুন করে পরিচিতি পান তিনি।কিন্তু গল্পে তখনও বাকি ছিল বড় মোড়।চলতি বছরের জুলাই মাসের এক রাতে শোভনকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সেটিই তাঁর চাকরির শেষ দিন। পরের দিন থেকে আর কাজে আসতে হবে না তাঁকে। সংস্থার তরফে কারণ হিসেবে গায়ে ঘামের গন্ধ এবং ডিউটির সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত গান গাওয়ার কথা বলা হয়। আডিশনকে শোভন বলেন,”রবীন্দ্রসঙ্গীত আমি অবচেতন মনেই অনেক সময় গেয়ে ফেলতাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি, সেটাই একদিন আমার জীবনে এত বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।”
কিন্তু গল্পটা সেখানেই থেমে থাকেনি। নিরাপত্তারক্ষীর পোশাকে ডিউটির ফাঁকে শোভনের রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর পাশে দাঁড়ান বহু মানুষ। তাঁর গান পৌঁছে যায় বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন ও সঙ্গীতশিল্পী রূপঙ্কর বাগচীর কাছেও। ইতিমধ্যেই তাঁর একটি গান রেকর্ডিং শেষ হয়েছে । চাকরি হারানোর সেই ধাক্কা আজও ভুলতে পারেননি শোভন। সংস্থার তরফে পরেও তাঁকে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর আর নিরাপত্তারক্ষীর কাজে ফিরতে মন চায়নি তাঁর।
শোভনের জন্য ১৯ শে সেপ্টেম্বর জিডি বিড়লা সভাঘরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের উদ্যোগও নেন তিনি ।তবে গানকে ছাড়েননি শোভন। বরং নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন পরীক্ষক হওয়ার, আবারও গান শেখানোর। তাঁর কথায়, “প্রাণ যায় যাক, তবু গান থেকে যাবে।”মায়ের কাছেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মায়ের কণ্ঠে শুনতেন, ‘আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি’। সেই সুরই পরবর্তীতে শোভনের জীবনের ভালবাসা হয়ে ওঠে।

