এভাবে চোর বদনাম দেওয়া মানে আমার ৪০ বছরের কেরিয়ারের সততাকে প্রশ্ন করা: স্ক্রিপ্ট চুরির অভিযোগে প্রসেনজিৎ
১৯ জুন,শুক্রবার বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছে ‘অভিমান’।ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।টিজার থেকে ট্রেলারে ‘আকাশ চট্টোপাধ্যায়’-এর রকস্টার লুকে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছেন তিনি।তবে ছবির মুক্তিপ্রাপ্ত দিনেই বিস্ফোরক দাবি ‘কাবুলিওয়ালা’ পরিচালক সুমন ঘোষের।সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও ‘অভিমান’ ছবির ভাবনা ও চরিত্র চুরির অভিযোগে সরব হন পরিচালক।এবার সেই অভিযোগের বিরুদ্ধেই ‘অভিমান’ ছবির গ্র্যান্ড প্রিমিয়ারে সরাসরি মুখ খুললেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
সুমন ঘোষের তোলা অভিযোগ নিয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন,“সুমন আমার ছোট ভাইয়ের মতো। গতকাল আমাকে একটা মেল পাঠিয়েছিল,তার ভিত্তিতেই আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি।ছবির প্রযোজনা সংস্থা থেকেও একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।কিন্তু অনেক কথা আমি শুনছি,যেগুলো সুমন নিজে আমাকে বলেনি। সিনেমা চুরি বা গল্প চুরির কথা সুমন কখনও আমাকে বলেনি।অথচ মানুষজন বলতে শুরু করে দিয়েছে যে আমরা গল্প চুরি করেছি।আমি একটাই কথা বলব, দি আমি গল্প চুরি করেই থাকি, তাহলে আমি সুমনকে অনুরোধ করব ওর বিশ্বস্ত মানুষদের নিয়ে অভিমান দেখুক।ছবিটা এখন সবার সামনে খোলা।দর্শকরাই বিচার করুন,গল্প বা চরিত্রের কোথায় মিল রয়েছে।ওর গল্প নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করতে চাই না, কারণ সেটা আমার নীতিবোধের মধ্যে পড়ে না।”সুমন ঘোষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “গতকাল আমি ফোন করেছিলাম অভিমান ভাঙানোর জন্য। শিল্পী মানুষদের মধ্যে অভিমান থাকতেই পারে। কিন্তু আমি ভাবিনি বিষয়টাকে এইভাবে দেখা হবে। যে অভিযোগটা সুমন নিজে করেনি, সেই অভিযোগ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। আমার সুমনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই, কোনও রাগও নেই। ওর অভিমান ভাঙানোর জন্য আমি এখনও প্রস্তুত।”
অভিনেতার দাবি, এই ধরনের অভিযোগ তাঁর দীর্ঘ চার দশকের কর্মজীবনের সততাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।প্রসেনজিৎ বলেন,“এভাবে চোর তকমা দেওয়া আমার ৪০ বছরের কেরিয়ারের সততাকে প্রশ্ন করা।যদি আমি কোনও অন্যায় করে থাকতাম,তাহলে স্বীকার করতে আমার কোনও সমস্যা থাকত না।কিন্তু আমি জানি,আমি কোনও অন্যায় করিনি।আমার সঙ্গে বহু পরিচালক ৩০-৪০টি করে ছবি করেছেন।সেই বিশ্বাসটা তো একদিনে তৈরি হয়নি।আমি একজন অভিনেতা। আমার জীবনে অন্তত ১০০ বার পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেছি, ডাক্তার হয়েছি, অপরাধীর চরিত্র করেছি, গায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছি। এটা একজন অভিনেতার স্বাধীনতা।সেই স্বাধীনতাকে কেন কেড়ে নেওয়া হবে? একটা চরিত্র পছন্দ করা এবং অভিনয় করা আমার পেশার অংশ।একজন অভিনেতা হিসেবে চরিত্র বেছে নেওয়ার অধিকার আমার আছে এবং সেই কাজের জন্যই আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। একটা চরিত্র আমি ‘চুরি’ করব কেন? এটা আমি ডিজার্ভ করি না।”
পরিচালক সুমন ঘোষের একটি পোস্টের পর তিনি নিজেও সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন।অভিনেতা লেখেন,”চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সুমনের প্রতি আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে।আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সৃজনশীল ভাবনার মধ্যে অনেক সময় মিল দেখা যায়,কারণ আমরা সকলেই মানুষের সার্বজনীন আবেগ ও অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিই।তবে অভিমান একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আইনিভাবে নিবন্ধিত প্রকল্প,যা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং লেখক সৃজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃজনশীলতায় নির্মিত হয়েছে।তিনি বলেন,”একজন অভিনেতা হিসেবে আমার কাজ হলো আমার হাতে তুলে দেওয়া চিত্রনাট্যের চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা।কারও সৃজনশীল বিশ্বাস বা আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না।আমি সুমনের জন্য আন্তরিকভাবে শুভকামনা জানাই এবং তাঁর ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করি।”এরপরই যিশু-সৌরভের প্রযোজনা সংস্থা থেকেও একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানানো হয়েছে,ছবিটির চরিত্র ও চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্মিত হয়েছে।
উল্লেখ্য,সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এক পোস্টে সুমন দাবি করেছেন,গত আড়াই বছর ধরে তিনি ‘স্টার’ নামে একটি ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে প্রসেনজিতের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছিলেন।তাঁর অভিযোগ,‘অভিমান’-এর টিজার ও ট্রেলারে যে সুপারস্টার চরিত্রকে দেখা গিয়েছে, তার সঙ্গে ‘স্টার’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।তিনি লেখেন,”আড়াই বছরে তোমার মতো একজন সিনিয়র,খ্যাতনামা অভিনেতার সাথে আমার বেশ কয়েকটি মিটিং হয়েছে।তোমায় ভেবেই চরিত্রটির দুটি ভিন্ন বয়স ও রূপ সাজানো হয়েছিল- জরাগ্রস্ত, অবক্ষয়ী রূপ এবং তরতাজা যৌবনের ইমেজ।এমনকি হোমওয়ার্ক হিসেবে আমি তোমায় এলভিস সিনেমাটি দেখতে বলেছিলাম।যদিও সেটি একজন মিউজিক সুপারস্টারকে নিয়ে,তবুও আমাদের ছবির ভাবনার সাথে তা প্রাসঙ্গিক ছিল।শেষবার,গত ডিসেম্বর মাসে আমাদের কথা চূড়ান্ত হয় যে এনআইডিয়াস ছবিটি প্রযোজনা করবে এবং সেই অনুযায়ী আমার প্রোডাকশন কোঅর্ডিনেটর একটি বাজেটও তোমাকে পাঠায়।সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তোমার অভিমান ছবির টিজার এবং ট্রেলারে প্রায় হুবহু একই রকম চরিত্রায়ণ, একই রকম দৃশ্য এবং উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।”
সুমনের দাবি, দুই ভিন্ন বয়সের লুক,ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয়,অসুস্থ অবস্থায় হুইলচেয়ারে থাকা,নিজের পুরনো ছবি ভেঙে ফেলার দৃশ্য এবং এক বিশ্বস্ত ম্যানেজারের উপস্থিতি— এই সবকটি বিষয় তাঁর চিত্রনাট্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।এছাড়াও পরিচালক জানান,ছবিটি নিয়ে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও নিশ্চুপ থাকেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।ইন্ডাস্ট্রির বহু শিল্পীর নাম উল্লেখ করে তিনি লেখেন,”এই ইন্ডাস্ট্রির বহু নামী এবং কিংবদন্তি শিল্পীর সাথে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে—যেমন সৌমিত্রকাকু, মিঠুনদা,শর্মিলা ঠাকুর বা অপর্ণা সেন।এঁদের কাছ থেকে প্রফেশনাল এথিক্স শেখা উচিৎ।এঁদের কারও কাছ থেকে এমন আচরণ অবিশ্বাস্য।তাই তোমার মতো একজন সিনিয়র অভিনেতার কাছ থেকে এই চরম অসৌজন্যমূলক উপেক্ষা এবং অনৈতিক আচরণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”শেষে তিনি লেখেন,”তোমার নতুন ছবির জন্য শুভকামনা রইল।হোক না তা অনৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে।”
