বলেছিলেন ‘পাখি হয়েও ফিরব’!  অবশেষে ফিরলেন তসলিমা, কলকাতা কি আজও তাঁর ঘর?

0



কলকাতা কখনও শুধু একটা শুধু শহর নয়। কারও কাছে সে আশ্রয়, কারও কাছে স্মৃতি, কারও কাছে অসমাপ্ত এক ভালোবাসা। আর তসলিমা নাসরিনের কাছে? কলকাতা যেন সেই ঘর, যার দরজা একদিন তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যার জানালায় তিনি আজও আলো জ্বলতে দেখেছেন।
১৮ বছর ৮ মাস ১০ দিন। ক্যালেন্ডারের হিসেবে সময়টুকু শুধু সংখ্যা। কিন্তু নির্বাসিত একজন মানুষের জীবনে এই সময়ের প্রতিটা দিন আলাদা যন্ত্রণা, আলাদা অপেক্ষা। শুক্রবার দুপুরে লাল পাড়, সাদা শাড়িতে কপালে লাল টিপ পরে কলকাতা বিমানবন্দরে পা রাখার মুহূর্তে তাই তাঁর মুখে শোনা গেল মাত্র তিনটি শব্দ- ‘খুবই ভালো লাগছে’। এই তিনটি শব্দের আড়ালেই যেন লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ আঠারো বছরের না-বলা অসংখ্য কথা।


২০০৭ সালের সেই অস্থির নভেম্বর। দ্বিখণ্ডিত বইকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়েছিল কলকাতা। বিতর্ক, প্রতিবাদ, হুমকি-সবকিছুর শেষে শহর ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। অথচ এই শহরেই তিনি বাংলা ভাষার পাঠকদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছিলেন। যে শহরকে তিনি নিজের বলেছিলেন, সেই শহর থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাঁকে। বাংলাদেশ তাঁকে নির্বাসিত করেছিল আরও আগে, ১৯৯৪ সালের আগস্টে। তারপর থেকে যেন তিনি এক অনন্ত যাত্রার পথিক। দেশ নেই, ঠিকানা নেই, অথচ ভাষা আছে। বাংলা ভাষাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমার হৃদয়ে কোনও কাঁটাতার নেই।’ সীমান্ত মানুষকে আলাদা করতে পারে, ভাষাকে নয়, পাসপোর্ট নাগরিকত্ব বদলাতে পারে, স্মৃতি নয়।
কলকাতাও যেন তাঁকে পুরোপুরি ভুলে যায়নি।

কয়েকদিন আগে গড়িয়াহাট ও সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে নিজের বিশাল হোর্ডিং দেখে আবেগে ভেসেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, একসময় তাঁর ধারাবাহিকের হোর্ডিং খুলে ফেলা হয়েছিল, সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আজ আর সেই হোর্ডিং নামানো হচ্ছে না। তাঁর কাছে সেটাই বাক্স্বাধীনতার জয়। তসলিমা একসময় লিখেছিলেন, ‘যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন।’ সেই পাখি অবশেষে ফিরে এসেছে। লাল পাড় সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ পরে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের শহরে প্রবেশ করলেন, তখন তা শুধু একজন লেখিকার সফর নয়, যেন দীর্ঘ নির্বাসনের শেষে নিজের ভাষার কাছে ফিরে আসার এক নীরব মুহূর্ত। বিমানবন্দরে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, অনুরাগীদের হাসিমুখ-সব মিলিয়ে যেন কলকাতা বলল, ‘স্বাগতম’। অথচ এই স্বাগতেও হয়তো মিশে ছিল ইতিহাসের এক অস্বস্তি। কারণ যে শহর একদিন তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই শহরই আজ তাঁকে বরণ করছে।


শনিবার রবীন্দ্র সদনে তাঁর বই প্রকাশ ও সংবর্ধনা। রবিবার বাংলা আকাদেমিতে অনুষ্ঠান। কিন্তু এই সফরের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান বোধহয় কোনও মঞ্চে নয়। তা ঘটেছে কলকাতার আকাশের নিচে, এক নির্বাসিত লেখিকার চোখে জমে থাকা অশ্রুতে। তসলিমা বহুবার বলেছেন, কলকাতায় এলেই তাঁর মনে দেশভাগের যন্ত্রণা জেগে ওঠে। হয়তো তাই এই ফেরা কোনও রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়, এটা ভাষার কাছে ফেরা, স্মৃতির কাছে ফেরা, অসমাপ্ত ভালোবাসার কাছে ফেরা। সব নির্বাসনের শেষ হয় না। সব ঘরে ফেরা স্থায়ীও হয় না। তবু কিছু ফিরে আসা ইতিহাস হয়ে থাকে। তসলিমা নাসরিনের এই কলকাতা-ফেরা ঠিক তেমনই-যেখানে বিমানবন্দরে নামেন একজন মানুষ, কিন্তু শহর তাকে বরণ করে নেয় নিজের হারানো এক শব্দের মতো।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *