ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমান, পাকিস্তান চেয়েছিল সেনাপ্রধান হিসেবে! ভারত পেয়েছিল এক শহিদ

0



১৯৪৭। সদ্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে তখন মিশে আছে দেশভাগের যন্ত্রণা। চারদিকে ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, রক্ত, আগুন। একদিকে নতুন ভারত, অন্যদিকে নতুন পাকিস্তান। আর সেই সময়েই বহু মানুষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল এক কঠিন প্রশ্ন, কোন দেশকে বেছে নেবেন?
ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমানের সামনেও এসেছিল সেই প্রশ্ন। তিনি ছিলেন মুসলিম। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসার। দেশভাগের পরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে যাওয়ার প্রস্তাব তাঁর কাছেও এসেছিল। এমনকি তাঁকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু উসমান অন্য রাস্তা বেছে নিলেন। তিনি থেকে গেলেন ভারতে।
তারপর ইতিহাস যেন তাঁকে সুযোগ দিল নিজের সিদ্ধান্তের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার।
১৯৪৭-এর শেষ দিকে জম্মু-কাশ্মীর তখন যুদ্ধক্ষেত্র। পাকিস্তানের মদতে আসা পাঠান বাহিনীর আক্রমণে একের পর এক এলাকা বিপন্ন। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ৫০ প্যারা ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার উসমান। নৌশেরা এবং ঝাঙ্গার হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ময়দান। ঝাঙ্গার একসময় হাতছাড়া হয়েছিল। কিন্তু সেই হার উসমানকে ভেঙে দেয়নি। বরং তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—ঝাঙ্গার পুনর্দখল না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিছানায় ঘুমোবেন না। সেই জেদ। তারপর থেকে মাটিতে চাদর পেতে রাত কাটাতেন তিনি।
তারপর এল নৌশেরা।
১৯৪৮-এর শীত। বিপুল সংখ্যক শত্রুসেনা ও যোদ্ধা নৌশেরার দিকে এগিয়ে আসছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ। কিন্তু সামনে ছিলেন উসমান। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা প্রবল আক্রমণ প্রতিহত করে। সেই যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বেই নৌশেরা রক্ষা পায়। তখনই তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে যায় একটি নাম ‘নৌশেরার শের’।
শত্রুর ভয়ও তখন তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা, সেই সময়ের হিসেবে বিরাট অঙ্ক। কিন্তু উসমান পিছিয়ে যাননি। তিনি জানতেন, যুদ্ধ মানে শুধু বন্দুক আর গোলা নয়। যুদ্ধ মানে মানুষের মনোবলও। তাই নিজের সেনাদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন তিনি। আর যে মানুষটি পাকিস্তানের প্রস্তাব ফিরিয়ে ভারতকে বেছে নিয়েছিলেন, তিনিই এবার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় মাটির রক্ষার জন্য লড়াই করছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই প্রতিজ্ঞাও পূরণ হয়। ঝাঙ্গার পুনর্দখল করে ভারতীয় বাহিনী। কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকে। ঝাঙ্গার ধরে রাখতে উসমানের নেতৃত্বে প্রতিরোধ চলতে থাকে।


১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই।
ঝাঙ্গারে তখন গোলাগুলি চলছে। শত্রুপক্ষের কামানের গোলা আছড়ে পড়ছে। সেই গোলার আঘাতেই গুরুতর আহত হন ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমান। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় তাঁর লড়াই। মাত্র ৩৫ বছর বয়স। স্বাধীন ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে, যে দেশ তাঁকে নিজের করে নিয়েছিল, তার জন্য প্রাণ দিয়ে গেলেন এক মুসলিম সেনানায়ক।
উসমানের শেষযাত্রাও ছিল তাঁর জীবনের মতোই অনন্য। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যে হাজির হয়েছিলেন দেশের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন-সহ মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য ছিলেন সেখানে। আর তাঁর জানাজার নামাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ।
একজন মুসলিম সেনানায়ক, যিনি ধর্মের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের জন্য লড়াই করেছিলেন, তাঁর শেষযাত্রায় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের এমন উপস্থিতি যেন আরও একবার বলে দিয়েছিল—উসমানের পরিচয় শুধু তাঁর ধর্মে নয়, তাঁর দেশপ্রেমে। পাকিস্তান তাঁকে চেয়েছিল। তিনি ভারতকে বেছে নিয়েছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত সেই ভারতীয় মাটিতেই রক্ত দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে অমর করে গেলেন।
তাঁকে মরণোত্তর মহাবীর চক্র দেওয়া হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ১৯৪৭-৪৮-এর যুদ্ধে শহিদ হওয়া সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অফিসার ছিলেন তিনি।
আজ স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তির দিনে তাই ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমানের গল্প শুধু এক সেনানায়কের গল্প নয়। এ গল্প মনে করিয়ে দেয়—
দেশের প্রতি আনুগত্যের কোনও ধর্ম হয় না।
আর সীমান্তের ওপারে শত্রু যখন গুলি চালায়, তখন সৈনিকের পরিচয় একটাই, সে ভারতীয়।

ছবি সৌজন্যে : Pinakpani

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *