‘দামু’ থেকে ‘সুবর্ণলতা’! পর্দা নামল এক নীরব কারিগরের—চলে গেলেন পরিচালক রাজা সেন

0



স্বাধীনতা দিবসের আবহ কাটতে না কাটতেই এল মনখারাপের খবর। রবিবার সকালে থেমে গেল বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ। প্রয়াত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক রাজা সেন। দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করার পর কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। স্ত্রী তথা অভিনেত্রী পাপিয়া সেন তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
শেষ কয়েকটা দিন ছিল কঠিন লড়াইয়ের। শুটিং চলাকালীন চোট পাওয়ার পর থেকেই শারীরিক সমস্যা বাড়তে থাকে। চলতি বছর কোমর ও শিরদাঁড়ায় অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। পরে নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের জটিলতা, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা-সহ একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। শেষপর্যন্ত ভেন্টিলেশনে রেখেও বাঁচানো গেল না বর্ষীয়ান পরিচালককে।
এই কঠিন সময়ে পরিবারের কাছেও নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। রাজা সেনের বড় মেয়ে জার্মানিতে থাকেন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে সদ্যই বিদেশে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। ফলে বাবার শেষযাত্রায় তাঁর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে মুম্বই থেকে এসে পৌঁছেছেন পরিচালকের ভাই। ছোট মেয়েও রয়েছেন পরিবারের পাশে।
রাজা সেনের চলে যাওয়া শুধু একজন পরিচালকের চলে যাওয়া নয়। বাংলা বিনোদন জগতের এমন একজন গল্পকারকে হারাল, যিনি ক্যামেরার সামনে জীবনকে কখনও কৃত্রিম করে তোলেননি। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সম্পর্ক আর বাঙালির চেনা জীবনযাপন—এই চারটি বিষয়ই যেন তাঁর সৃষ্টির মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছিল।
চলচ্চিত্রে আসার আগেই ছোটপর্দায় নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন রাজা সেন। দূরদর্শনের পর্দায় তাঁর পরিচালিত ‘সুবর্ণলতা’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যকে টেলিভিশনের ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘অনির্বাণ’-এর মতো ধারাবাহিকেও তাঁর স্বাক্ষর ছিল।
তবে বড়পর্দায় তাঁর আত্মপ্রকাশই হয়ে উঠেছিল এক স্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৯৬ সালে ‘দামু’ দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবির পরিচালনায় আসেন রাজা সেন। একটি সরল মানুষের সঙ্গে হাতির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি সেই ছবি শুধু দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়নি, জাতীয় স্তরেও সম্মান পেয়েছিল। সেরা শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার আসে তাঁর ঝুলিতে।
এরপর একে একে এসেছে ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’-র মতো ছবি। ‘আত্মীয় স্বজন’ জাতীয় স্তরে সম্মান পাওয়ার পাশাপাশি কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়েছিল। ‘দেশ’-এ জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চনের মতো শিল্পীদের নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।
শুধু কাহিনীচিত্র নয়, তথ্যচিত্র নির্মাণেও তাঁর আলাদা পরিচয় ছিল। সুচিত্রা মিত্র, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তপন সিংহের মতো বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির দিকপালদের নিয়ে তাঁর কাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে রয়েছে। সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রের জন্যও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। মোট তিনবার জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন রাজা সেন।
২০১৯ সালে ‘ভালবাসার গল্প’ ছিল পরিচালকের শেষদিকের উল্লেখযোগ্য কাজ। তারপর ধীরে ধীরে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে ক্যামেরার পিছনের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু তাঁর তৈরি চরিত্র, গল্প আর সম্পর্কের ভিতর দিয়ে রাজা সেন থেকে গেলেন বাঙালির স্মৃতিতে।
তিনি চলে গেলেন। থেকে গেল ‘দামু’র মায়া, ‘সুবর্ণলতা’র স্মৃতি, সাহিত্যের পাতায় তাঁর ক্যামেরার স্পর্শ আর বাঙালি জীবনের প্রতি তাঁর গভীর মমতা। বাংলা সংস্কৃতির যে সময়টাকে তিনি এত যত্নে পর্দায় ধরে রেখেছিলেন, তাঁর প্রয়াণে সেই সময়েরই যেন আরও একটি দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
ছবি সৌজন্যে রাজা সেন ফেসবুক (Raja Sen Facebook)

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *