স্ট্র্যান্ডে প্যারিসের আবহ, পুরনো রেজিস্ট্রি ভবনে ফিরছে প্রাণ- নতুন করে সাজল চন্দননগর

0



চন্দননগর শুধু একটা শহর নয়, এ যেন গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো স্মৃতি। যেখানে ফরাসি দিনের ছাপ মিশে গিয়েছে বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু চন্দননগরের বুক থেকে মুছে যায়নি সেই পুরনো দিনের মায়া।
গঙ্গার পাড়ের স্ট্র্যান্ডে দাঁড়ালে তাই শুধু নদী দেখা যায় না, চোখের সামনে খুলে যায় ইতিহাসের এক জানলা। ফরাসি আমলের স্থাপত্য, পুরনো গভর্নর হাউস, পাতালবাড়ি, প্রাচীন কবরস্থান-সব মিলিয়ে এই শহরের নিজস্ব একটা আবহ তৈরি হয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে জগদ্ধাত্রী পুজোর আলো ঝলমলে কার্নিভাল আর সূর্যমোদকের জলভরা সন্দেশের মিষ্টি টান। ইউরোপীয় ছোঁয়া আর বাঙালির আবেগ-চন্দননগরের পরিচয় যেন এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই।
সেই পুরনো চন্দননগরকেই নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। শুক্রবার থেকে শহরে শুরু হয়েছে তিন দিনের ‘বঁজু চন্দননগর’ বা ইন্দো-ফ্রেঞ্চ শেয়ার্ড হেরিটেজ উৎসব। রাজ্য সরকারের পর্যটন দফতর এবং ভারতে ফ্রান্সের দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে চলবে এই আয়োজন। শুক্রবার গঙ্গাবক্ষে জলপথে শহরে আসেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথিউ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ, চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ, হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলী কাদরী, পুলিশ কমিশনার সুনীল যাদব-সহ বিশিষ্টরা।
এই আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চন্দননগরের পুরনো ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবন। ১৮৭৫ সালে তৈরি এই ভবন একসময় ছিল ব্যস্ততার কেন্দ্র। আদালতের কাজও হয়েছে এখানে। সময়ের ধাক্কায় জীর্ণ হয়ে পড়া ভবনটিকে ২০১৭ সালে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়। এ বার তার পুরনো চেহারা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকার এবং ফরাসি পক্ষের মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। বহুদিনের অপেক্ষার পর তাই যেন ফের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেল শহরের এক হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস। ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথিউর কথাতেও উঠে এসেছে চন্দননগরের প্রতি সেই টান। তাঁর মতে, চন্দননগর একটি ‘জীবন্ত নগর’। পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষের বক্তব্যেও উঠে এসেছে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনা।

চন্দননগরের ফরাসি ঐতিহ্য, শ্রীরামপুরের ডাচ ঐতিহ্য এবং বাঁশবেড়িয়ার পর্তুগিজ ঐতিহ্যকে জলপথে জুড়ে ‘লিটল ইউরোপ অন দ্য গ্যাঙ্গেস’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রবর্তক সংঘ-সহ চন্দননগরের বৈপ্লবিক ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে।
এদিকে উৎসব ঘিরে নতুন সাজে সেজেছে স্ট্র্যান্ড। কোথাও প্যারিসের রাস্তার আবহ, কোথাও ইউরোপীয় ধাঁচের দোকান ও ক্যাফে। চন্দননগরের বিখ্যাত আলোকশিল্পকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ সাজসজ্জা। থাকছে ফরাসি ও ইউরোপীয় খাবারের পাশাপাশি ভারতীয় খাবারের আয়োজন। সন্ধ্যায় সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গঙ্গার ধারে বিশেষ গঙ্গা আরতিও থাকছে। আসলে চন্দননগরের সৌন্দর্য শুধু তার পুরনো বাড়িতে নয়। তার আসল মায়া লুকিয়ে আছে সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েও নিজের গল্পটা ধরে রাখার ক্ষমতায়। একটা হারিয়ে যেতে বসা সময়কে আবার ছুঁয়ে দেখার আবেগে ভাসছে চন্দননগরবাসী। ছবি সৌজন্যে ফেসবুক। Photo courtesy: Facebook

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *