‘আমাকে লুকিয়ে দেখেন কেন?’- পর্দার সেই নীপার স্মৃতিতে মন ভারাক্রান্ত রঞ্জিত মল্লিকের
‘আমাকে লুকিয়ে দেখেন কেন? সোজাসুজি দেখবেন!’- নীপার সরল অথচ দুষ্টু প্রশ্ন। সামনে সিতেশ। একটু অপ্রস্তুত রঞ্জিত মল্লিকের উত্তর, ‘না মানে… আমি দেখছিলাম…।’ ‘মৌচাক’-এর পর্দায় এই সামান্য কথোপকথনেই যেন ধরা পড়েছিল এক সময়ের বাংলা সিনেমার মায়া। সিতেশ-নীপার সেই রসায়ন আজও বাঙালি দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।সেই নীপার চলে যাওয়ার খবরে আজ যেন আচমকাই থেমে গেল সত্তরের দশকের সেই চেনা হাসি।
৭১ বছর বয়সে প্রয়াত মিঠু মুখোপাধ্যায়। প্রায় এক বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর রবিবার রাতে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা চলচ্চিত্র জগত। আর প্রিয় সহকর্মীকে হারিয়ে স্মৃতির ভারে যেন আরও একবার সেই পুরনো দিনগুলিতে ফিরে গেলেন রঞ্জিত মল্লিক।
মিঠুর প্রয়াণের খবর পাওয়ার পর থেকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না অভিনেতা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রঞ্জিত মল্লিক বলেন, ‘খুব অবাক লাগছে। খবরটা শোনার পর থেকে কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারছি না। মিঠু আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছিল। এমন একটা দুঃসংবাদ এত তাড়াতাড়ি পাব, কী করে এমন হল ভাবতেই পারছি না। সত্যি বলতে, প্রথমে যখন ফোনগুলো আসছিল, বিশ্বাস করতেই চাইনি। কারণ এখন তো নানা রকম ভুল খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই ভেবেছিলাম, হয়তো সেরকমই কিছু। কিন্তু পরে যখন চারপাশ থেকে নিশ্চিত হলাম, তখন বুকটা খালি হয়ে গেল। কীভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেব জানি না।’ তার পরেই স্মৃতির দরজা খুলে যায়। একসঙ্গে কাজের সেই দিনগুলিতে ফিরে গিয়ে রঞ্জিত বলেন, ‘চোখের সামনে আমরা দিনের পর দিন একসঙ্গে কাজ করেছি। ‘মৌচাক’-এ উত্তমদার পাশে কিংবা ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-য় ওর যে অভিনয়, তা ভোলা সম্ভব নয়। সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ছায়াদেবীর মতো মহীরুহদের সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে অভিনয় করত, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
‘মৌচাক’-এর সিতেশ আর নীপার সেই রসায়ন শুধু একটি ছবির জনপ্রিয় জুটি হয়ে থাকেনি। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ১৯৭৪-এর ছবিটি বাঙালি দর্শকের মনে এখনও আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে। পরের বছর ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-তেও রঞ্জিত-মিঠুর জুটি দর্শকের ভালবাসা পেয়েছিল। ‘ভাগ্যচক্র’-তেও একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল তাঁদের। পর্দার এই জুটি তাই বাংলা সিনেমার এক বিশেষ সময়েরও স্মারক।
সত্তরের দশকের বাঙালি রূপকথার এক উজ্জ্বল নাম মিঠু মুখোপাধ্যায়। ‘নীপা’র সরলতা, ‘মর্জিনা’র রঙিন মায়া আর ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র আত্মবিশ্বাস-বিভিন্ন চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি একসময় বহু দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিল। বাংলা ছবির গণ্ডি পেরিয়ে ওড়িয়া ভাষাতেও ‘মৌচাক’-এর রিমেকে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
আজ পর্দার সেই নীপার কণ্ঠ নেই। নেই নতুন কোনও চরিত্রে ফিরে আসার অপেক্ষাও। থেকে গেল তাঁর অভিনয়, সেই চোখে চোখ রাখা সংলাপ, আর সিতেশ-নীপার মতো কিছু মুহূর্ত-যেগুলি সময় পেরিয়েও পুরনো হয় না। শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে রঞ্জিত মল্লিকের কথায় তাই শুধু শোক, ‘ওর আত্মার শান্তি কামনা করা ছাড়া আর কিছুই বলার ভাষা নেই আমার। যেখানেই থাকুক, ও যেন শান্তিতে থাকে।’

