যে হাতে লাঙল দিয়েছিলেন বাবা, সেই হাতেই আজ রাইফেল! এশিয়াডে রুপো হিমাংশুর
একটা সময় কুস্তির আখড়ায় নামতেন হিমাংশু ধিল্লন। আজ সেই ছেলেটাই এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে গলায় রুপোর পদক। মাঝের পথটা মোটেই সহজ ছিল না। ছিল কুস্তি ছেড়ে দেওয়া, মাঠে বাবার সঙ্গে কাজ, ধার করে কেনা রাইফেল, অর্থকষ্ট আর নিজের সঙ্গে লড়াই। তাই জাপানের রেঞ্জে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সঙ্গে শেষ শট পর্যন্ত লড়ে রুপো জেতার গল্পটা শুধুই সাফল্যের নয়, ঘুরে দাঁড়ানোরও।
পরিবারে কুস্তির ঐতিহ্য ছিল। অলিম্পিয়ান কাকা হরদীপ সিং ধিল্লনকে দেখে হিমাংশুকেও আখড়ায় নামিয়েছিলেন বাবা শামশের। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝে যান, এই খেলার ধকল তাঁর শরীরের জন্য নয়। পেশিতে ব্যথা, চোট- সব মিলিয়ে কুস্তি ছেড়ে দেন তিনি। অথচ তারপরও কোনও লক্ষ্য ছিল না। পড়াশোনাতেও মন বসত না।
ছেলেকে তখন অন্য শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন বাবা। নিয়ে যেতেন চাষের জমিতে। রোদে, মাটিতে কাজ করতে করতে হিমাংশু বুঝেছিলেন পরিশ্রম করে সংসার চালানোর মানেটা। সেই সময়ই বাড়ির কাছে একটা শুটিং রেঞ্জে যাওয়া শুরু। শুরুটা ছিল নিছক মজা করে। প্রথমবার নিশানা করে স্কোর করেছিলেন মাত্র ১। কিন্তু সেই এক থেকেই ধীরে ধীরে বদলে গেল জীবন।
কোচ কুলদীপ নেহরা প্রতিভা বুঝে বলেছিলেন, ভালোভাবে এগোতে হলে নিজের রাইফেল দরকার। দাম প্রায় তিন লক্ষ টাকা। পরিবারের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সহজ ছিল না। তবু ছেলের স্বপ্ন থামতে দেননি শামশের। স্থানীয় এক আর্থিয়ার কাছ থেকে ধার করে রাইফেল কিনে দেন। পরে ফসল ওঠার পর শোধ করেন সেই টাকা।
ছেলের প্রশিক্ষণের জন্য নিজের থাকার জায়গাও বদলে ফেলেছিলেন বাবা। কৈথালে গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থেকে ছেলের অনুশীলনের পাশে থেকেছেন। বছরের পর বছর নিজের সঞ্চয়ের বড় অংশ ঢেলেছেন হিমাংশুর কেরিয়ারে। এমন সময়ও এসেছে, যখন আর্থিক চাপের কারণে ছেলেকে চাকরি খুঁজতে বলেছিলেন। পরে নবীন জিন্দালের স্কলারশিপ এবং Olympic Gold Quest-এর সহায়তাও তাঁর যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর মধ্যেই সাফল্য আসতে শুরু করে। ২০২৫ সালের ISSF জুনিয়র বিশ্বকাপে সোনা, ২০২৬ সালের এশিয়ান শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে জোড়া সোনা—ধীরে ধীরে বড় মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করেন হিমাংশু। কিন্তু এশিয়ান গেমসের আগে মানসিক চাপও ছিল। নিজের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন জাগত। কোচ নেহা চাভান এবং মনোবিদ শিবম দ্বিবেদীর সাহায্যে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠেন। তারপর আসে সেই দিন। দলগত ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রুদ্রাঙ্ক পাতিল ও পার্থ মানের সঙ্গে রুপো জেতার পর ব্যক্তিগত ফাইনালে নামেন হিমাংশু। একে একে প্রতিদ্বন্দ্বীরা ছিটকে যান। সামনে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শেং লিহাও। শেষ শটেও দু’জনের স্কোর ১০.৬। সোনা গেল চিনের শুটারের কাছে। ২৩১.০ পয়েন্টে রুপো পেলেন হিমাংশু।
পদক জেতার পর মনে পড়ে যায় বাবার সেই কথাই- ‘পদকের রং নিয়ে ভাবিস না, একটা পদক নিয়ে আয়।’
কুস্তির আখড়া থেকে ধানের জমি, সেখান থেকে শুটিং রেঞ্জ- আজ সেই পথ পেরিয়ে এশিয়ান গেমসের পোডিয়ামে হিমাংশু। হাতে রাইফেল, গলায় রুপো। আর সেই পদকের ঝলকে মিশে আছে এক বাবার ত্যাগ আর ছেলের হার না মানা জেদ। ছবি সৌজন্যে এক্স হ্যান্ডেল (Image courtesy: X handle)
