বাংলায় আয়ুষ্মান ভারত! কারা পাবেন, কোথায় হবে ক্যাশলেস চিকিৎসা? জেনে নিন সম্পূর্ণ গাইড
অবশেষে পশ্চিমবঙ্গেও চালু হতে চলেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বহু রাজ্যে এই প্রকল্প কার্যকর থাকলেও বাংলার মানুষ এতদিন তার বাইরে ছিলেন। সরকার বদলের পর এ বার সেই ছবিই পাল্টাতে চলেছে। এই প্রকল্প চালু হলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ পরিবার বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। শুধু সরকারি হাসপাতাল নয়, কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত বহু বেসরকারি হাসপাতালেও এই পরিষেবা মিলবে। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি বা জটিল অস্ত্রোপচারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসায় বড় স্বস্তি মিলতে পারে সাধারণ মানুষের।তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন, কারা এই সুবিধা পাবেন? কোথায় চিকিৎসা করানো যাবে? কী কী খরচ কভার হবে? প্রবীণদের জন্য নতুন নিয়মই বা কী? সব মিলিয়ে আয়ুষ্মান ভারত নিয়ে রইল বিস্তারিত গাইড।
আয়ুষ্মান ভারত আসলে কী?
২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে শুরু হয় এই প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, অর্থাভাবে যাতে কোনও পরিবার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি পরিবার বছরে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পায়। চিকিৎসা হয় সম্পূর্ণ ক্যাশলেস। অর্থাৎ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই প্রকল্প শুধুমাত্র একটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তালিকাভুক্ত হাসপাতালে একই সুবিধা পাওয়া যায়।
কারা আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাবেন?
কেন্দ্রের নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী মূলত আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলিকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।
যোগ্যতার তালিকায় রয়েছেন—
১) বার্ষিক আয় আড়াই লক্ষ টাকার কম এমন পরিবার ২) কাঁচা বাড়ি বা এক কামরার ঘরে বসবাসকারী পরিবার ৩) তফশিলি জাতি ও তফশিলি জনজাতি পরিবার ৪) বিশেষভাবে সক্ষম সদস্য থাকা পরিবার ৫) অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী পরিবার
৭০ ঊর্ধ্বদের জন্য বড় সুবিধে-
৭০ বছর বা তার বেশি বয়সি সমস্ত প্রবীণ নাগরিক আয় নির্বিশেষে এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ তাঁদের ক্ষেত্রে আর আয়ের সীমা দেখা হবে না। এমনকি যেসব পরিবার আগে থেকেই আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় রয়েছে, সেই পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকার টপ-আপ কভারও থাকবে।
কারা এই সুবিধে পাবেন না?
সব পরিবার অবশ্য এই প্রকল্পের আওতায় আসবে না। কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী ১) যাদের ব্যক্তিগত দুই বা চার চাকার গাড়ি রয়েছে ২) যাদের বার্ষিক আয় আড়াই লক্ষ টাকার বেশি ৩) মাছ ধরার নৌকার মালিক পরিবার ৪) উচ্চ আয়ের করদাতা পরিবার এই প্রকল্পের বাইরে থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বড় সুবিধে কী?
আয়ুষ্মান ভারতের অন্যতম বড় শক্তি হল এর জাতীয় নেটওয়ার্ক। বাংলার বাসিন্দা হলেও আপনি দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই বা বেঙ্গালুরুর তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবেন। ফলে রাজ্যের বাইরে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও আলাদা করে বিপুল খরচের চাপ থাকবে না।
কোন হাসপাতালে পরিষেবা মিলবে?
১) সরকারি হাসপাতাল ২) কেন্দ্র অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ৩) সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল
কী কী চিকিৎসা কভার হবে?
শুধু সাধারণ চিকিৎসা নয়, প্রায় ১৯০০-রও বেশি জটিল চিকিৎসা প্যাকেজ রয়েছে এই প্রকল্পে।
কোন কোন চিকিৎসাগুলি অন্তর্ভুক্ত
ক্যানসারের চিকিৎসা, হার্ট সার্জারি, কিডনি প্রতিস্থাপন, ব্রেন সার্জারি, ডায়ালিসিস, আইসিইউ চিকিৎসা, অর্থোপেডিক অপারেশন, মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা
শুধু অপারেশন নয়, এই খরচও কভার হবে
অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র অস্ত্রোপচারের খরচই এই বিমায় পাওয়া যায়। বাস্তবে সুবিধার পরিধি আরও অনেক বড়।
চিকিৎসকের পরামর্শ, মেডিক্যাল পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে ৩ দিনের চিকিৎসা খরচ , হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী, আইসিইউ ও নন- আইসিইউ পরিষেবা, ডায়গনস্টিক ও ল্যাব টেস্ট, হাসপাতালের বেড ও খাবারের খরচ, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৫ দিন পর্যন্ত চিকিৎসা , রোগী আনা-নেওয়ার নির্দিষ্ট ভাতা।
প্রবীণদের জন্য নতুন নিয়মে কী বদল?
কেন্দ্র সম্প্রতি প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আরও কিছু বিশেষ সুবিধা যুক্ত করেছে।৭০ ঊর্ধ্বদের সবার জন্য আলাদা আয়ুষ্মান কার্ড। অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকার টপ-আপ কভার। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও আয়ুষ্মানের সুবিধা পাওয়া যাবে।
কীভাবে জানবেন আপনি যোগ্য কি না?
১. আয়ুষ্মান ভারত অ্যাপ বা PM-JAY ওয়েবসাইটে যেতে হবে
২. “Am I Eligible” অপশনে ক্লিক করতে হবে
৩. আধার নম্বর দিয়ে যাচাই করতে হবে
এছাড়াও কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এ গিয়েও তথ্য জানা যাবে।
বাংলার মানুষের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?
স্বাস্থ্যসাথীর মতো রাজ্যভিত্তিক প্রকল্পের বাইরে এবার জাতীয় স্তরের স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কের সুবিধা পেতে চলেছেন বাংলার মানুষ। বিশেষ করে যাঁরা চিকিৎসার জন্য ভেলোর, দিল্লি, মুম্বই বা চেন্নাইয়ের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের কাছে আয়ুষ্মান ভারত বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ, জটিল চিকিৎসার বিপুল খরচ সামলাতে গিয়ে বহু পরিবারকে ঋণ নিতে বা সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়।
