‘যাকে ভালবাসো, তার সবটা নিয়েই বাসবে’, ৩০ বছর পরও সেই হাতটাই ধরে অপরাজিতা আঢ্য
‘তুমি যাকে ভালবাসো, তার সবটা নিয়ে বাসবে।’ ‘প্রাক্তন’ ছবির সেই সংলাপ আজও বাঙালি দর্শকের মনে গেঁথে আছে। ভালবাসার মানুষটার শুধু ভালটা নয়, তাঁর রাগ, অভিমান, ভুল, অসম্পূর্ণতা—সবটুকুকেই আপন করে নেওয়ার কথাই যেন বলা হয়েছিল সেখানে। আর সেই ছবিতেই ছিল আরও একটা কথা—‘অ্যাডজাস্টমেন্ট মানে হেরে যাওয়া নয়।’ বরং কখনও একটু নরম হওয়া, কখনও নিজের জায়গা থেকে সরে এসে অন্য মানুষটাকে বুঝতে চাওয়াই হয়তো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।
পর্দার সেই কথাগুলো যেন এবার বাস্তব জীবনের সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে মিলে গেল। টলিউডে যখন সম্পর্ক ভাঙার খবর, বিচ্ছেদের জল্পনা কিংবা দাম্পত্যে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে একের পর এক চর্চা, তখন অপরাজিতা আঢ্য ও অতনু হাজরার গল্পটা যেন অন্যরকম এক উত্তর। ২৯ বছর পেরিয়ে ৩০ বছরে পা দিল তাঁদের সংসার। তিন দশক ধরে একই মানুষের হাত ধরে পথ চলা—আজকের সময়ে যা নিঃসন্দেহে উদযাপন করার মতো এক সম্পর্কের গল্প। অপরাজিতার কাছে অবশ্য এই সম্পর্ক শুধুই দীর্ঘস্থায়ী কোনও দাম্পত্যের পরিসংখ্যান নয়। বরং তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কারই তাঁর বিয়ে। বিবাহবার্ষিকীতে সেই উপলব্ধির কথাই সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন অভিনেত্রী।
জীবনের নানা সময়ে তাঁকে বিচার করা হয়েছে। ভুল খোঁজা হয়েছে। বোঝার আগেই তাঁর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর যে পরিবারে তিনি গিয়েছিলেন, সেখানে যেন সেই বিচার-ব্যবস্থার দরজাটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর ভুলকে শুধু ভুল হিসেবে দেখা হয়নি। বরং বিশ্বাস করা হয়েছে, ভুলের পিছনেও হয়তো কোনও কারণ রয়েছে, কোনও ভাল উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর অসম্পূর্ণতার মধ্যেও খুঁজে নেওয়া হয়েছে ভালটা। তাঁকে গ্রহণ করা হয়েছে ঠিক যেমন তিনি। এই ‘নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা’কেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন অপরাজিতা। আর হয়তো এখানেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের সম্পর্কের তিন দশকের রহস্য। কারণ দীর্ঘ সংসার মানে তো প্রতিদিন নিখুঁত থাকা নয়। বরং প্রতিদিনের ছোটখাটো ভুল, অভিমান, মতের অমিল, ব্যস্ততা, জীবনের ওঠাপড়ার মধ্যেও একে অপরের পাশে থাকার চেষ্টা।
আজও সেই চাওয়াটাই অপরাজিতার। জীবনের বাকি পথটুকুও যেন সেই মানুষটির হাত ধরেই হেঁটে যেতে পারেন। যে হাত এত বছর ধরে তাঁর হাত ধরে রয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেই হাতটাই যেন থাকে পাশে। এই গল্পে তাই শুধু অতনু নন, অপরাজিতার জীবনের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকেও স্মরণ করার দিন এটি। তাঁর প্রথম ছবির পরিচালক প্রয়াত জগন্নাথ গুহ। অভিনেত্রীর আজকের অবস্থানে পৌঁছনোর পিছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এমনকি অতনুর সঙ্গে অপরাজিতার পরিচয়ের সূত্রও এসেছিল তাঁর হাত ধরে। তাই আনন্দের এই দিনেও কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধায় সেই মানুষটিকে মনে করেছেন অভিনেত্রী। ভালবাসার সংজ্ঞা হয়তো সবার কাছে আলাদা। কারও কাছে তা রোম্যান্স, কারও কাছে বন্ধুত্ব, কারও কাছে নিঃশর্ত পাশে থাকা। অপরাজিতার তিন দশকের সংসার যেন সেই সংজ্ঞায় আরও একটা শব্দ যোগ করে—গ্রহণ করা। মানুষটিকে তাঁর সবটা নিয়েই গ্রহণ করা।
‘প্রাক্তন’-এর সংলাপ তাই যেন শেষ পর্যন্ত সিনেমার পর্দাতেই আটকে থাকল না। বাস্তবের অপরাজিতার জীবনেও তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল। ভালবাসা মানে শুধু হাত ধরা নয়, সেই হাতটা ধরে থাকার জন্য প্রতিদিন একটু করে একে অপরকে বুঝে নেওয়া। আর ৩০ বছর পরেও সেই হাতটা না ছাড়াই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রেমের গল্প।
