মেসির জয়, কিন্তু বিশ্বকাপ জুড়ে হৃদয় জিতলেন ভোজিনহা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির নাম লেখা আছে, যাঁদের হাতে উঠেছে সোনালি ট্রফি। কিন্তু এমনও কিছু ফুটবলার থাকেন, যাঁরা ট্রফি না জিতেও মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যান। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা সেই বিরল মানুষদেরই একজন। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলেও তাঁর গল্প ফুটবলপ্রেমীদের মনে বহুদিন বেঁচে থাকবে।
পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। জনসংখ্যা মাত্র কয়েক লক্ষ। সেই দেশের মিন্ডেলো শহরে জন্ম নেওয়া জোসিমার জোসে এভোরা ডিয়াজকে আজ গোটা ফুটবল বিশ্ব চেনে ‘ভোজিনহা’ নামে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছিলেন তিনি। পাড়ার মাঠে বড়দের সঙ্গে খেলতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, মার খাওয়া, কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরা—এসবই ছিল তাঁর শৈশবের অংশ। সেই সময় দাদির আদরের ছেলে বলেই যে ডাকনাম পেয়েছিলেন, সেটাই একদিন হয়ে ওঠে তাঁর বিশ্বজোড়া পরিচয়।

মজার বিষয়, ছোটবেলায় তিনি গোলরক্ষক হতে চাননি। স্বপ্ন ছিল স্ট্রাইকার হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় গোলপোস্টের নিচে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক অসাধারণ যাত্রা। দেশের বিভিন্ন ক্লাবে খেলার পর অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, পর্তুগাল, সাইপ্রাস ও স্লোভাকিয়ার ক্লাব ফুটবলেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। ২০১২ সালে কেপ ভার্দে জাতীয় দলে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। ২০২৪ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পেছনেও বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। টাইব্রেকারে বিদায়ের যন্ত্রণা তাঁকে একসময় জাতীয় দল ছাড়ার কথা ভাবতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সতীর্থদের অনুরোধে তিনি থেকে যান। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল-স্বপ্ন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেই স্বপ্নই পূরণ হয় ২০২৬ বিশ্বকাপে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে ওঠে কেপ ভার্দে। বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল হজম করে ৭টি ক্লিন শিট রেখে দেশের সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের অন্যতম স্থপতি ছিলেন ভোজিনহা।
বিশ্বকাপে প্রথম বড় পরীক্ষাই ছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিরুদ্ধে। সবাই একপেশে ম্যাচের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে যেন মানুষ নয়, এক অদম্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনহা। সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে তিনি স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেন এবং ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। নকআউটে সামনে আসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেখানেও একই ছবি। লিওনেল মেসির একের পর এক আক্রমণ, ফ্রি-কিক, স্পট-কিক—সবকিছুর সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করেন ভোজিনহা। পুরো ম্যাচে করেন সাতটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেভ, যার বেশিরভাগই ছিল মেসির বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে কেপ ভার্দে বিদায় নিলেও, ফুটবল বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল—এই ম্যাচের প্রকৃত নায়ক ছিলেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক। ম্যাচ শেষে চোখের জল লুকোতে পারেননি ভোজিনহা। তিনি বলেন, যাঁরা তাঁকে মানুষ করেছেন, সেই দাদু-দিদা আজ আর বেঁচে নেই। তাঁরা থাকলে এই মুহূর্তটা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করতেন। ভিসার সমস্যায় প্রথম ম্যাচে তাঁর মাও গ্যালারিতে থাকতে পারেননি। ব্যক্তিগত এই অপূর্ণতার মাঝেও দেশের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন তিনি। ৪০ বছর বয়সে হয়তো এটাই ছিল ভোজিনহার শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো আর কখনও বিশ্বমঞ্চে তাঁকে গ্লাভস হাতে দেখা যাবে না। কিন্তু তাঁর গল্প কখনও শেষ হবে না। কারণ, তিনি শুধু একজন গোলরক্ষক নন, তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশের আকার নয়, স্বপ্নের উচ্চতাই একজন মানুষকে বড় করে তোলে। কেউ ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হন, আর কেউ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর অদম্য লড়াই দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে যান। ভোজিনহা সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ-যিনি হারলেও কখনও হারেননি, বরং জিতে নিয়েছেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়।
