‘নর্দমার নোংরা ঢুকতে দেব না’, টলিপাড়ার জট কাটাতে মিঠুনের কড়া বার্তা,অকপট রুদ্রনীল-রূপা

0



রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই টলিপাড়ার অন্দরে বদলেছে সমীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন, গিল্ড এবং ফেডারেশনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক জটিলতা। ফেডারেশন থেকে ইমপা টলিপাড়ার একাধিক সংগঠনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই অচলাবস্থার জেরেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির বহু কলাকুশলী। তবে এ বার রদবদলের পালা।সোমবার নন্দনে টলিপাড়ার টেকনিশিয়ান, শিল্পী, প্রযোজক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী।তিনি জানান,আগামী ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর ফেডারেশনের আওতাধীন ২৬টি গিল্ডে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গিল্ডের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই নতুন ফেডারেশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান মিঠুন।

সোমবার বিকেলে নন্দনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী,রুদ্রনীল ঘোষ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, জিৎ-সহ টলিপাড়ার একাধিক পরিচিত মুখ এবং বিভিন্ন বিভাগের কলাকুশলীরা।এদিন বৈঠকের পর মিঠুন চক্রবর্তী স্পষ্ট করে দেন, তাঁর মূল লক্ষ্য হল নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠনগুলির দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া। তাঁর বক্তব্য, “গিল্ডের নির্বাচন না হলে ফেডারেশন তৈরি হবে না। ইলেকশন করতেই হবে, ইলেকশনের কার্ডও বানাতে হবে এবং বিনা কার্ডে কাউকে কাজ করতে দেওয়া হবে না।”শুধু নির্বাচন করলেই দায়িত্ব শেষ নয়, নতুন ব্যবস্থায় প্রকৃত কর্মীদের পরিচয় নিশ্চিত করার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। মিঠুনের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈধ সদস্যদের জন্য নতুন করে গিল্ড কার্ড তৈরি করা হবে। সেই কার্ডের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবি, সংগঠনগুলির কাঠামো পরিষ্কার হলে একদিকে যেমন কর্মীদের কাজ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে, তেমনই বাংলার বাইরে থেকেও আরও কাজ টলিউডে আনা সম্ভব হবে।

ফেডারেশন গঠনের পর ইমপার সঙ্গেও আলোচনায় বসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মিঠুন। তাঁর মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে গিল্ডগুলির নতুন কমিটি তৈরি হওয়ার পর ফেডারেশন গঠন করা হবে। এরপর ইম্পার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নিয়ম ও চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। সেই পথেই টলিপাড়ার দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টা হবে।তিনি বলেন, “যেদিন ইলেকশন হয়ে যাবে, ফেডারেশন হয়ে যাবে, ইম্পার সঙ্গে কথা বলা হবে, চুক্তি হবে সেদিন সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এখানে কোনও রাজনীতি থাকবে না। কিন্তু যতদিন ইলেকশন না থাকবে, আমার চোখ খোলা থাকবে, কোনও নোংরা নর্দমা আর ঢুকতে দেব না।”প্রসঙ্গত,মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৩০ বছর ধরে টেকনিশিয়ান এবং ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে মিঠুনের। সেই অভিজ্ঞতাকে এ বার বাংলার ইন্ডাস্ট্রির কাজে লাগাতে চান তিনি।

বৈঠক শেষে মিঠুনের নেতৃত্ব নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেতা জিৎ।টলিউডের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েই এদিন আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। দ্রুত এই জটিলতা কাটবে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন জিৎ।
একইভাবে বৈঠকের সিদ্ধান্তে খুশি টেকনিশিয়ান মহলও। রুদ্রনীল ঘোষ জানান, টলিপাড়ার বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিরাই এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কথায়, “৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর আমাদের গিল্ডগুলোর নির্বাচন হবে, ফেডারেশনে নির্বাচন হয়ে নতুন কমিটি তৈরি হবে এবং আমরা টলিউডকে এগিয়ে নিয়ে যাব।” তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর এই সিদ্ধান্তে টলিপাড়ার টেকনিশিয়ানদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।

গিল্ডের সদস্যপদ নিয়েও এদিনের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, এমন কিছু মানুষকে বিভিন্ন গিল্ডে সদস্য করা হয়েছে, যাঁদের প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগ নেই। সেই বিষয়টি এবার সংশ্লিষ্ট গিল্ডগুলির হাতেই ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।রূপার বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁরা সত্যিই বছরের পর বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন, তাঁরা নিজেদের সহকর্মীদের চেনেন। তাই কে প্রকৃত সদস্য এবং কে নন, সেই বাছাইয়ের দায়িত্ব গিল্ডের সদস্যদের উপরেই থাকা উচিত। তাঁর কথায়, “যেখানে যেসব টেকনিশিয়ানের নামে জল ঢোকানো হয়েছিল, যাঁরা কোনওদিন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাঁদের অন্য নানা গিল্ডে ঢোকানো হয়েছিল, কার্ড দেওয়া হয়েছিল। এবার গিল্ডের আসল সদস্যরাই নিজেদের মধ্যে ছাঁটাই-বাছাই করবেন।” মেকআপ গিল্ড-সহ একাধিক গিল্ডে সদস্যপদ নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, নতুন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারও সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিনের বৈঠকে শুধু ভোট বা সদস্যপদ নয়, টেকনিশিয়ান এবং শিল্পীদের কাজের সময় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অচলাবস্থার মধ্যেই শুটিংয়ের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। রুদ্রনীল ঘোষের দাবি, কোথাও ১৮ ঘণ্টা, কোথাও ২০ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত শুটিং করানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, কাজ শেষ হওয়ার পর শিল্পী বা টেকনিশিয়ানদের বাড়ি ফেরার জন্য যথাযথ ব্যবস্থাও সবসময় করা হয়নি বলে অভিযোগ।এই পরিস্থিতিকে শুধু পেশাগত সমস্যা নয়, মানবিক এবং নিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও দেখার কথা বলা হয়েছে বৈঠকে। নতুন ফেডারেশনের কমিটি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত যেন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের নিয়ম ভেঙে কলাকুশলীদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করা হয়, সেই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের পর ভোটের মাধ্যমে টলিপাড়ার সংগঠনগুলিকে নতুন কাঠামোয় ফেরানোর এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন নজর সেদিকেই।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *