নীরব মহামারির রূপ নিচ্ছে মানসিক সংকট, সমীক্ষায় এল উদ্বেগজনক তথ্য, কারণ জানেন?
একসময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এটা শুধুই ব্যক্তিগত সংকট নয়।বরং বিশ্বজুড়ে এক নীরব মহামারি।কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের ফলে মানসিক ক্লান্তি, সম্পর্কের দূরত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং বয়স্কদের একাকীত্ব— সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে মানুষের মানসিক বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এখন এই পরিস্থিতিকে ‘স্লো মোশন সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস’ বলেও বর্ণনা করছেন।এই আবহেই সম্প্রতি ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি বড় সমীক্ষা সামনে আনল অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য।
গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯৫.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, গত ৩৩ বছরে মানসিক রোগের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মানসিক সমস্যার কারণে বিশ্বজুড়ে ১৭১ মিলিয়ন ডিসএবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স নষ্ট হয়েছে। সহজ ভাষায়, মানসিক অসুস্থতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন, কর্মক্ষমতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রার মান হারাচ্ছেন। বর্তমানে মানসিক অসুস্থতা বিশ্বে অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। সমীক্ষায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য। প্রথমবার দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের উপরই মানসিক সমস্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অবসাদের হার দ্রুত বাড়ছে।
এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—
• সমাজমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো
• নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা
• ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
• পড়াশোনা ও কর্মজীবনের চাপ
• পারিবারিক দূরত্ব
• বাস্তব জীবনে সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া
কোন কোন মানসিক সমস্যা বাড়ছে?
• উদ্বেগজনিত সমস্যা
• অবসাদ
• মনোযোগ ঘাটতি
• দ্বিমুখী মানসিক ব্যাধি
• সিজোফ্রেনিয়া
• অটিজম বর্ণালীজনিত সমস্যা
• খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যা
গবেষণার প্রধান লেখক এবং কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ড্যামিয়ান স্যান্টোমাউরো জানিয়েছেন, এই পরিসংখ্যান দেখে তিনি সত্যিই বিস্মিত। তাঁর মতে,বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর এবং জটিল হয়ে উঠতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে, দারিদ্র্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা,সামাজিক অস্থিরতা এবং কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক ঘটনাগুলি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬২০ মিলিয়ন মহিলা এবং ৫৫২ মিলিয়ন পুরুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, যেখানে মহিলাদের উপর সামাজিক চাপ ও পারিবারিক দায়িত্বের প্রভাব বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
• প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমোন।
• নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা যোগাভ্যাস করুন।
• দিনে কিছু সময় মোবাইল, সমাজমাধ্যম ও ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকুন।
• নিজের অনুভূতি চেপে না রেখে পরিবারের সদস্য বা কাছের মানুষের সঙ্গে ভাগ করুন।
• অতিরিক্ত কাজের চাপ এড়িয়ে চলুন, প্রয়োজন হলে বিরতি নিন।
• অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার অভ্যাস কমান।
• পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটান।
• ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস বা মন শান্ত রাখার অনুশীলন করুন।
• সুষম খাবার খান এবং শরীরের যত্ন নিন।
• দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্রাম, মানসিক শান্তি এবং আবেগগত সুস্থতাকে আর বিলাসিতা হিসেবে দেখলে চলবে না। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ মনও একটি সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি।
