ফুসফুস কি আগেই দিচ্ছে বিপদের সংকেত? ধূমপায়ীদের যা জানা জরুরি
অনেক ধূমপায়ীর কাছেই ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে আসে না। বরং শরীরের কিছু ছোট ছোট পরিবর্তনই ধীরে ধীরে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে ঠেলে দেয়। দীর্ঘদিনের কাশি, আগের তুলনায় বেশি হাঁপিয়ে যাওয়া বা শরীরের ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই—এমন অনুভূতি প্রথমে তেমন গুরুত্ব না পেলেও এগুলোই হতে পারে ফুসফুসের ক্ষতির প্রাথমিক সংকেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্ষতি অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়, যদিও তার লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে সময় লাগে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে অনুযায়ী, ভারতে অধিকাংশ মানুষ ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যেই নিয়মিত তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার শুরু করেন। ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্র ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময় পর্যন্ত শরীর হয়তো বছরের পর বছর এই ক্ষতির সঙ্গে লড়াই করে এসেছে।
যে লক্ষণগুলোকে সাধারণ ভেবে এড়িয়ে যান অনেকেই
সকালের কাশি, অল্প হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা সিঁড়ি ভাঙতে শ্বাসকষ্ট—এসবকে অনেকেই বয়স, আবহাওয়া বা ফিটনেসের অভাব বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এগুলো ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে। ধীরে ধীরে হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না।
কীভাবে ধূমপান ফুসফুসের ক্ষতি করে?
ফুসফুসের অতিরিক্ত কার্যক্ষমতার কারণে দীর্ঘদিন ক্ষতি হলেও তা সহজে ধরা পড়ে না। ধূমপানের প্রথম আঘাত পড়ে সিলিয়া-র উপর। শ্বাসনালির এই সূক্ষ্ম চুলের মতো গঠন ধুলো, জীবাণু ও বিষাক্ত কণা বাইরে বের করে দেয়। ধূমপানের ফলে সিলিয়া দুর্বল হয়ে পড়লে ক্ষতিকর পদার্থ জমতে শুরু করে। এর ফলেই দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, হুইজিং, বারবার সংক্রমণ ও অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাড়তে পারে প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের প্রভাব শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ফুসফুসের ক্যানসার এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। উদ্বেগের বিষয়, এই রোগগুলির অনেকই ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং প্রথম দিকে স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগ ধরা পড়ার আগেই শরীরের অনেকটা ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ধূমপান ছাড়ার পথে বড় বাধা
যদিও অনেক ধূমপায়ী শরীরের পরিবর্তন অনুভব করার পর ধূমপান ছাড়ার কথা ভাবেন, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখা সহজ নয়। সিপলা হেলথের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৯ শতাংশ ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়ার প্রথম মাসের মধ্যেই আবার ধূমপানে ফিরে যান। দীর্ঘমেয়াদে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশে।এছাড়া ধূমপান ছাড়ার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তার ব্যবহারও খুব কম। মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ কুইট-স্মোকিং অ্যাপ সম্পর্কে জানেন এবং মাত্র ২ শতাংশ মানুষ কখনও এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করেছেন।
সময়মতো সচেতন হওয়াই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ছাড়ার জন্য কখনওই দেরি হয়ে যায় না। ধূমপান বন্ধ করার পর শরীর ধীরে ধীরে নিজেকে মেরামত করতে শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ফুসফুসের কার্যক্ষমতার উন্নতি হয়। তাই দীর্ঘদিনের কাশি, সামান্য শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, হুইজিং বা বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণকে অবহেলা করবেন না। এই ছোট ছোট লক্ষণই ফুসফুসের বড় ক্ষতির আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিলে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও অনেকটাই বাড়ে।
