‘আমি ভারতীয় ,দেশদ্রোহী নই,গ্রেফতার করুন একাই লড়ব’, মোদীর আপত্তিকর পোস্টার বিতর্কে বিস্ফোরক শ্রীলেখা
নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আয়োজিত একটি প্রতিবাদ মিছিল।এই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। সেই আন্দোলনের মাঝেই হাতে একটি পোস্টার নিয়ে তাঁর তোলা একটি ছবি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। পোস্টারে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি কুরুচিকর ও আপত্তিকর ছবি ছিল।ঘটনার জেরে অভিনেত্রীর নামে সোনারপুর, আনন্দপুর সহ একাধিক থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।তবে এবার সরাসরি মুখ খুললেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র।
তিনি বলেন, “আমি কিন্তু হিন্দু, ভারতীয়, আমি কিন্তু দেশদ্রোহী নই।” অভিনেত্রীর দাবি, তাঁকে উদ্দেশ্য করে লাগাতার কুরুচিকর ভাষায় আক্রমণ, প্রাণনাশের হুমকি এবং অপমানজনক মন্তব্য করা হলেও সেই বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।শ্রীলেখার বক্তব্য, “আমার কাছে প্রাণনাশের হুমকি আসছে, আমাকে যখন ওই পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, তখন কোথায় সবাই? ওই পাড়ার মেয়েদের জন্য আমার অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে। আমার যদি সত্যিই সেটাই পেশা হত, আমি বলতাম সেটাই আমার পেশা। ঘোমটার নিচে খ্যামটা নাচি না আমি।”
তিনি জানান, আন্দোলনের সময় পুলিশের লাঠিচার্জের কারণে চারদিকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় তিনি ছাত্র-যুবদের সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন। তাঁর কথায়, “ওই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কে আমার হাতে পোস্টার ধরিয়ে দিয়েছে বা কারও থেকে নিয়ে আমি ছবি তুলেছি, সেখানে মোদীর জননাঙ্গের দিকে আমার চোখ যায়নি। চোখ যায় তাঁদের, যাঁরা আমাকে নোংরা ভাষায় মেসেজ করে যাচ্ছে।”অভিনেত্রীর দাবি, তিনি বাড়ি থেকে ওই পোস্টার তৈরি করে নিয়ে যাননি। তাঁর কথায়, পোস্টারটি দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন থেকেই এসেছিল। পরিস্থিতির চাপে তাঁকে একটি পোস্টার ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পিছনে পুলিশের লাঠিচার্জ চলায় পোস্টারটি ভালো করে দেখার সুযোগ পাননি। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই ওই পোস্টার তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
শ্রীলেখা বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “দিল্লির মসনদ নড়ে গিয়েছে। আরশোলার দল একটা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। তাই এখন সবাইকে ছেড়ে শ্রীলেখা মিত্রকে ধর।”একসঙ্গে বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়াকেও তিনি পরিকল্পিত বলেই দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, “এটা পুরো একটা প্ল্যান। আমি বলেছি, গ্রেফতার করুন। দল পাশে না থাকলেও আমি একাই লড়ব। আমি আবার আন্দোলন করব। আমি যেটা ঠিক মনে করি, সেটাই করি।”রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে শ্রীলেখা বলেন, “আমি সারাজীবন সিপিএমকেই ভোট দেব। তবে আমাদের দলও যখন ভুল করেছে, তখনও আমি প্রতিবাদ করেছি। অভয়ার মাকে নিয়ে গান বাঁধার বিরোধিতাও আমি করেছিলাম। আমার কাছে আগে সত্য, তারপর দল,তারপর সবকিছু।”অভিনেত্রীর বক্তব্য, “আমার মৃত্যু-ভয় নেই। আমি চাই, আমি মারা যাওয়ার পর মানুষ যেন বলে, এই মহিলা নিজের লাভ না দেখে যেটা ঠিক মনে করেছেন, সেটাই করেছেন।”
বিতর্কিত পোস্টার সম্পর্কে অভিনেত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, “আমি যদি পোস্টারটা আগে দেখতে পেতাম, তা হলে কোনওদিনও সেটা হাতে নিয়ে ছবি তুলতাম না। আমার কি এই রুচি? আমার তো জেন-জি মেয়ে রয়েছে। ও যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, মা তুমি এটা কী করে করলে? আমি কী উত্তর দেব? আমি তো জানতামই না, এমন কোনও পোস্টার রয়েছে।”তিনি জানান, আন্দোলনের সময় জাতীয় পতাকার সঙ্গে কালো পতাকা ওড়ানোর বিরোধিতাও তিনি করেছিলেন।
দেশদ্রোহিতার অভিযোগের জবাবে শ্রীলেখা বলেন, “যাঁরা আমাকে দেশদ্রোহী বলছেন, তাঁরা আগে আয়নায় নিজেদের দেখুন।বিজেপি মানে ভারত নয়, আবার ভারত মানেই বিজেপিও নয়। এটা গণতন্ত্র। আমাদের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আমরা ভোট দিয়ে সরকার গড়ি, আবার প্রয়োজন হলে ভোট দিয়েই নামিয়ে আনব। এখানে কেউ দেবতা নয়।”শ্রীলেখার দাবি, পরিকল্পিতভাবেই তাঁর হাতে ওই বিতর্কিত পোস্টার তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, দেশে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলেও সেগুলি নিয়ে আলোচনা না করে শুধুমাত্র এই বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে তাঁকে নিশানা করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে টাকা পাচ্ছেন বলেও যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, সত্যিই যদি এমন কোনও টাকা পেতেন, তবে তা নিজের জন্য নয়, পথপ্রাণীদের আশ্রয় ও পরিচর্যার কাজেই ব্যয় করতেন। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনার পর থেকে তাঁকে লাগাতার কুরুচিকর বার্তা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অথচ সেই হুমকির বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি বলেও জানান অভিনেতা।
উল্লেখ্য, ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষ আনন্দপুর থানায় শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫২ (শান্তিভঙ্গের উস্কানি), ৩৫৩(উস্কানিমূলক আচরণে প্রকাশ্যে সমর্থন) এবং ৩৫৬ (মানহানি) ধারায় মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বিধাননগর সাইবার ক্রাইম-সহ একাধিক থানাতেও অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে শ্রীলেখাও জানিয়েছেন,বিষয়টি নিয়ে তিনিও আইনের দ্বারস্থ হবেন এবং লড়াই করবেন।
