উত্তম কুমার মানেই ইন্ডাস্ট্রি, ইন্ডাস্ট্রি মানে উত্তম কুমার : দেবশ্রী রায়
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের উপস্থিতি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। তাঁদেরই অন্যতম মহানায়ক উত্তম কুমার। পর্দায় তাঁর হাসি, চোখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ভঙ্গি কিংবা অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরন—সবকিছুই তাঁকে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।শতবর্ষ পেরিয়েও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর আসন আজও অমলিন।আগামী ৩ সেপ্টেম্বর মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে তাই মহানায়ককে ঘিরে শুরু হয়েছিল যামিনী রায় গ্যালারিতে বিশেষ প্রদর্শনী ‘উত্তম-দ্য মহানায়ক’। আর সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধনে এসে উত্তম-স্মৃতিতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। সাফ জানিয়ে দিলেন, “উত্তম কুমার মানেই ইন্ডাস্ট্রি, আর ইন্ডাস্ট্রি মানেই উত্তম কুমার।”
প্রদর্শনীর উদ্বোধনে এসে উত্তম কুমারের সঙ্গে নিজের ছোটবেলার স্মৃতি ভাগ করে নেন দেবশ্রী রায়। মহানায়কের স্নেহ, তাঁর গান এবং ব্যক্তিত্বের কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রীর গলায় ধরা পড়ে আবেগ। তিনি জানান, ছোটবেলায় উত্তম কুমারের কোলে বসার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে কাজও করেছেন। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে উত্তম কুমারের গান গাওয়ার স্মৃতিতে ভেসেছিলেন অভিনেত্রী।উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করতে না পারার আক্ষেপও রয়ে গিয়েছে দেবশ্রীর মনে। তাঁর কথায়,”ঈশ্বরের কৃপায় ওঁর মতো মানুষের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছি। মহানায়কের কোলেও চড়েছি, তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। তবে শেষদিন পর্যন্ত আফসোস থাকবে, ওঁর সঙ্গে কাজ করতে পারলাম না।”
এদিন উত্তম কুমারের ‘মহানায়ক’ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি’ পরিচয় নিয়েও এদিন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন দেবশ্রী। সাম্প্রতিক সময়ে অন্য অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ তকমা জুড়ে দেওয়া হলেও, দেবশ্রীর মতে এই অভিধা একজনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাঁর কথায়, “মহানায়ক একজনই-উত্তম কুমার। উত্তম কুমার মানেই ইন্ডাস্ট্রি, আর ইন্ডাস্ট্রি মানেই উত্তম কুমার।” উত্তম কুমারকে শুধু অতীতের নায়ক হিসেবে দেখেন না দেবশ্রী। বরং তাঁর অভিনয় আজকের প্রজন্মের কাছেও সমান আধুনিক বলে মনে করেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন,”উনি একজন মডার্ন অ্যাক্টর। এখনকার প্রজন্ম ওঁর কোনও ছবি দেখলে মনে হবে না যে পুরনো কোনও ছবি দেখছে। মনে হবে, এখনই অভিনয় করা কোনও ছবি দেখছি।”
উত্তম কুমারকে অভিনয়ের প্রতিষ্ঠান বলেও উল্লেখ করেন দেবশ্রী। তাঁর মতে, অভিনয় শিখতে গেলে মহানায়কের কাজ দেখাই যথেষ্ট।প্রদর্শনীতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন “উনি একটা ইনস্টিটিউশন। ওঁকে দেখলেই শেখা হয়ে যাবে। এখনকার কেউ যদি আমার কাছে অভিনয় শেখার কথা জানতে চায়, আমি বলব উত্তম কুমারের ছবি দেখো, ওখান থেকেই অনেক কিছু শিখতে পারবে।” অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় জানান, উত্তম কুমারের মতো অভিনেতা দ্বিতীয়বার আসা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, “উনি ঈশ্বরপ্রাপ্ত মহানায়ক।কুমোর যেমন ঠাকুর তৈরি করে,তেমন ঈশ্বর তৈরি করে পাঠিয়েছে এরকম একজন মহানায়ককে।ওনার কাছাকাছি কেউ পৌঁছতে পারেনি, পারবেও না। দ্বিতীয় উত্তম কুমার আর হবে না।”
উল্লেখ্য,১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে পরবর্তীকালে গোটা বাংলা চিনেছে উত্তম কুমার নামে। একাধিক ছবিতে ব্যর্থতার পরও থেমে যাননি তিনি। ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দিয়ে তৈরি করেন এক নতুন পরিচয়।’সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সাফল্যের পর সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি হয়ে ওঠে বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অধ্যায়। এরপর ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘চিড়িয়াখানা’- র মতো একাধিক ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন উত্তম কুমার।
