রোনাল্ডোর ইতিহাস, মদ্রিচের বিদায়- এক আলিঙ্গনে থমকে গেল ফুটবল

0



কেউ জেতে, কেউ হারে। কিন্তু কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে স্কোরলাইনটাই শেষ কথা নয়। টরন্টোর রাত ছিল ঠিক তেমনই। ২-১ গোলের জয় নিয়ে পর্তুগাল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় উঠলেও, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল দুই কিংবদন্তি—ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও লুকা মদ্রিচ।
ম্যাচ শুরুর আগেই জানা ছিল, এই লড়াই হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁদের একজনের শেষ অধ্যায় লিখে দেবে। ফুটবলপ্রেমীরা তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, দেখছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে দুই মহাতারকার শেষ যুদ্ধ। প্রথমার্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল পর্তুগালের। কিন্তু গোলের দেখা মেলেনি। উল্টো বিরতির পর ৫৩ মিনিটে ইভান পেরিসিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। মুহূর্তেই যেন বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ছায়া নেমে আসে রোনাল্ডোর ওপর।
কিন্তু কিংবদন্তিরা শেষ কথা সহজে বলতে দেন না। ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথায় গোল করে সমতা ফেরান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। এই গোল শুধু পর্তুগালকে ম্যাচে ফেরায়নি, ভেঙেছে তাঁর দীর্ঘদিনের আক্ষেপও। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটাই রোনাল্ডোর প্রথম গোল। এতদিন যে প্রশ্নটা বারবার উঠেছে,নকআউটে রোনাল্ডো কোথায়?—সেই প্রশ্নের জবাব তিনি দিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চেই।


এরপর নাটক যেন আরও জমে ওঠে। ৮১ মিনিটে রোনাল্ডো মাঠ ছাড়তেই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এটাই কি তাঁর শেষ বিশ্বকাপ স্পর্শ? কিন্তু ভাগ্য তখনও শেষ দৃশ্যটা লিখে রাখেনি। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লেয়াওয়ের নিখুঁত ক্রসে গনসালো রামোসের দুর্দান্ত হেডে জালের ঠিকানা খুঁজে নেয় বল। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগাল। বেঞ্চ থেকে ছুটে এসে সতীর্থদের সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠেন রোনাল্ডোও। শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া গোল পেলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। আর সেখানেই শেষ হয়ে যায় লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ যাত্রা।


শেষ বাঁশি বাজার পর ফুটবল যেন আরও একবার নিজের সৌন্দর্য দেখাল। বহু বছর রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে একসঙ্গে অসংখ্য ট্রফি জেতা দুই বন্ধু আবার মুখোমুখি হলেন, তবে এবার ভিন্ন আবেগে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এগিয়ে গিয়ে লুকা মদ্রিচকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। আরেকবার আলিঙ্গনে বাঁধলেন তাঁকে। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য হয়তো এই ম্যাচের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে।
পরে রোনাল্ডো বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাকে বিদায় বলেছি। সে ফুটবলের একজন কিংবদন্তি। এখনও তাই আছে।’ কথাগুলো যেন শুধু একজন প্রতিপক্ষকে নয়, এক বন্ধুকে সম্মান জানানোর ভাষা।


জয়ের আনন্দের মাঝেও ছিল অন্য এক আবেগ। ম্যাচ শেষে ২১ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন রোনাল্ডো। তা ছিল প্রয়াত সতীর্থ দিয়োগো জোতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। গত বছরের ৩ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় জোতা ও তাঁর ভাই আন্দ্রে সিলভা প্রাণ হারিয়েছিলেন। ঠিক এক বছর পর সেই দিনেই পর্তুগালের জয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের জল লুকোতে পারেননি রোনাল্ডো। যেন জয় উৎসর্গ করলেন হারিয়ে যাওয়া এক সতীর্থকে।
এটাই ফুটবল। এখানে একদিকে ইতিহাস লেখা হয়, অন্যদিকে শেষ হয়ে যায় আরেকটি স্বপ্ন। এক কিংবদন্তি নতুন রেকর্ড গড়েন, আরেক কিংবদন্তি নীরবে বিদায় নেন। কিন্তু টরন্টোর রাত প্রমাণ করে দিল, ট্রফি, গোল কিংবা পরিসংখ্যানের বাইরেও ফুটবলকে অমর করে রাখে এমন কিছু মুহূর্ত—যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষে জিতে যায় শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *