২২ বছরের কান্না মুছে লাল হলুদে ভাসল শহর, ‘ভারতসেরা’ ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে আবেগের বিস্ফোরণ
এ যেন শুধুই ফুটবল জয় নয়, এক প্রজন্মের অপেক্ষার অবসান। একসময় বাবার হাত ধরে মাঠে আসা সমর্থক আজ নিজের সন্তানকে কাঁধে তুলে বলছেন, ‘দেখ, এটাই ইস্টবেঙ্গল’! ২২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অবশেষে ভারতসেরা হয়েছে লাল হলুদ। আর সেই মুহূর্তকে ঘিরে শুক্রবার লেসলি ক্লডিয়াস সরণিতে তৈরি হল আবেগ, উন্মাদনা আর ভালোবাসার এক অন্য পৃথিবী।
সকাল গড়ানোর আগেই ক্লাব তাঁবুর সামনে জমতে শুরু করেছিল মানুষের ঢল। কেউ হাতে পতাকা, কেউ গায়ে লাল-হলুদ জার্সি, কেউ আবার মুখে রঙ মেখে হাজির শুধুই একটা মুহূর্তকে ছুঁয়ে দেখতে। চারপাশে শুধু একটাই স্লোগান ‘জয় ইস্টবেঙ্গল’! আবিরে ঢেকে যাচ্ছিল রাস্তা, ঢাকের তালে নাচছিলেন সমর্থকেরা, আর গ্যালারির আবেগ যেন ছড়িয়ে পড়ছিল গোটা শহরে। অনেকের চোখে জল। কারণ এই জয় শুধু ট্রফি জেতার আনন্দ নয়, বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর গল্প। শেষবার জাতীয় লিগ জয়ের সময় যাঁরা তরুণ ছিলেন, তাঁদের চুলে আজ পাক ধরেছে। কেউ কেউ আর নেইও। তাই এই ট্রফি যেন হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকেও ফিরে পাওয়ার অনুভূতি এনে দিল। ক্লাবের সামনে একঝাঁক তরুণকে দেখা গেল নতজানু হয়ে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করতে। যেন এই মাটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের শিকড়, পরিচয় আর আবেগ।

ক্লাবের বাইরে তখন উৎসবের মেলা। পতাকা, ব্যাজ, টিফো, ‘চ্যাম্পিয়ন’ লেখা টি-শার্ট, সবকিছুই মুহূর্তে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মুখেও লাল-হলুদ রঙ। কেউ গান ধরেছে, কেউ ঢাক বাজাচ্ছে, কেউ আবার মোবাইলের আলো জ্বেলে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকছে। অচেনা মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, যেন বহুদিনের চেনা সম্পর্ক। এই উন্মাদনার মাঝেও বারবার ফিরে এসেছে কোচ অস্কার ব্রুজোঁর নাম। মরশুমের মাঝপথে তাঁর ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর হাত ধরেই এল স্বপ্নপূরণ। তাই সমর্থকদের হাতে হাতে দেখা গেল ‘স্টে অস্কার’ পোস্টার। যেন ট্রফির পাশাপাশি কোচকেও ধরে রাখতে চাইছে লাল-হলুদ পরিবার।

উৎসবের কেন্দ্রে ছিলেন ফুটবলাররাও। ইউসুফ, নন্দকুমার, রশিদ, এডমুন্ড-প্রত্যেককে ঘিরেই উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ডার্বির নায়ক এডমুন্ড লালরিনডিকাকে দেখেই নতুন করে গর্জে ওঠে সমর্থকদের ভিড়। ক্লাবের ভিতরে পোডিয়ামে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে গোটা দল যখন উল্লাসে মেতে ওঠে, তখন যেন একসঙ্গে হেসে উঠেছিল গোটা লাল-হলুদ জনপদ। আবেগে ভেসেছেন সাধারণ সমর্থক থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। সিপিএম নেত্রী দীপ্সিতা ধর চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘রশিদের গোলে ইস্টবেঙ্গলের জয়ে সকল উদ্বাস্তু জয়’। সেই এক কথাতেই যেন ধরা পড়ে যায় ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষের ইতিহাস সংগ্রাম, বেঁচে থাকা আর হার না মানার কাহিনি। এই জয় শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও। কারণ একই মরশুমে দেশের সেরা হয়েছে ইস্টবেঙ্গলের পুরুষ ও মহিলা,দুই দলই। এবার এশিয়ার মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবে লাল-হলুদ। তবে শুক্রবারের রাতে সেই সব হিসেবের থেকেও বড় হয়ে উঠেছিল একটাই অনুভূতি, অবশেষে ফিরে এসেছে ইস্টবেঙ্গল। আর সেই প্রত্যাবর্তনের আনন্দে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল ময়দান। ছবি সৌজন্যে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব
