এক যুগের সমাপ্তি! পেপের বিদায়ের খবরে আবেগে ভাসছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি
ফুটবলে কিছু বিদায় থাকে, যা শুধুই একজন কোচের প্রস্থান নয়, একটা সময়ের শেষ অধ্যায়। পেপ গুয়ার্দিওলার ম্যাঞ্চেস্টার সিটি অধ্যায়ের শেষটাও ঠিক তেমনই। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের আলো নিভবে না, গ্যালারিতে সমর্থকদের গানও থামবে না, কিন্তু রবিবারের পর আর টাচলাইনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নির্দেশ দিতে দেখা যাবে না সেই মানুষটিকে, যিনি এক দশকে বদলে দিয়েছিলেন ম্যাঞ্চেস্টার সিটির ইতিহাস, পরিচয় এবং আত্মা। তাই হয়তো বিদায়ের আগেই ক্লাব তাঁকে অমর করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের নর্থ স্ট্যান্ডের নতুন নাম হচ্ছে ‘দ্য পেপ গুয়ার্দিওলা স্ট্যান্ড’। কোনও ট্রফির চেয়েও যেন বড় এই সম্মান। কারণ এটা শুধুই একজন সফল কোচের স্বীকৃতি নয়, বরং এক যুগের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

২০১৬ সালে যখন পেপ ইংল্যান্ডে এসেছিলেন, তখন ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ছিল ধনী ও উচ্চাভিলাষী এক ক্লাব। সাফল্য ছিল, তারকা ছিল, কিন্তু ছিল না স্থায়ী ফুটবল-দর্শন। পেপ এসে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিলেন। তিনি শুধু একটি দল তৈরি করেননি, তিনি তৈরি করেছিলেন এক নতুন ফুটবল-সভ্যতা। বল দখলের নন্দনকানন, ছন্দময় আক্রমণ, নিখুঁত পজিশনাল ফুটবল, ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির ফুটবলে এনে দিয়েছিলেন শিল্পের স্পর্শ। দশ বছরে ২০টি ট্রফি। ছ’টি প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একাধিক কাপ, সংখ্যাগুলো ইতিহাস বলবে। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও পেপের সবচেয়ে বড় সাফল্য, তিনি ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত পরিবারে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছেন। ২০২৩ সালে ক্লাব ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের রাতটি যেন সেই যাত্রার শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। সেই রাতে শুধু ট্রফি জেতেনি সিটি, পূর্ণতা পেয়েছিল পেপের স্বপ্নও।
অ্যাস্টন ভিলার বিরুদ্ধে ম্যাচটা হবে ইতিহাদে তাঁর শেষ ম্যাচ। তাই আবেগ এখন গ্যালারি ছাপিয়ে শহরের রাস্তাতেও। সমর্থকেরা জানেন, তাঁরা শুধু একজন কোচকে বিদায় দিচ্ছেন না, বিদায় জানাচ্ছেন নিজেদের জীবনের সেরা ফুটবল-অধ্যায়কে। বহু সমর্থকের কাছে পেপ মানে ছিল রবিবারের আনন্দ, অসাধারণ ফুটবলের নিশ্চয়তা, আর অসম্ভবকে সম্ভব করার আত্মবিশ্বাস। বিদায়ের আগে পেপ নিজেও যেন আবেগ চেপে রাখতে পারেননি। তাঁর কথায়, ‘কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আমি অনুভব করছি, এটাই সঠিক সময়। তবে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির প্রতি আমার ভালোবাসা কখনও শেষ হবে না’। এই কয়েকটি বাক্যেই ধরা পড়ে যায় সম্পর্কের গভীরতা।

তবে এই বিদায় সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়। কোচের দায়িত্ব ছাড়লেও ভবিষ্যতে সিটি ফুটবল গ্রুপের গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত থাকবেন তিনি। যেন সম্পর্কটা শুধু পেশাদার নয়, তার থেকেও অনেক বেশি কিছু। পেপ গুয়ার্দিওলা শুধু ট্রফি জেতেননি। তিনি ইংলিশ ফুটবলের ভাষা বদলে দিয়েছেন। ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুলের সঙ্গে তাঁর লড়াই আধুনিক প্রিমিয়ার লিগকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য উচ্চতায়। ফুলব্যাককে মিডফিল্ডে তোলা, ডিফেন্ডার দিয়ে আক্রমণ গড়া, প্রচলিত স্ট্রাইকার ছাড়া লিগ জেতা, ফুটবলের কৌশলগত মানচিত্রই যেন নতুন করে এঁকেছেন তিনি। আর সেই কারণেই তাঁর বিদায়টা এত আবেগের। কারণ, পেপ চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে যাচ্ছেন এক দর্শন, এক সংস্কৃতি, এক অনন্ত স্মৃতি। ইতিহাদের গ্যালারিতে হয়তো নতুন কোচ আসবেন, নতুন ট্রফিও উঠবে। কিন্তু ম্যাঞ্চেস্টার সিটির আকাশে পেপ গুয়ার্দিওলার নামটা চিরকাল আলোর মতোই জ্বলবে।
