রাজা থাকবেন, নাকি জন্ম নেবে নতুন সম্রাট? বিশ্বকাপে অদ্য শেষ রজনী…

0



বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন। বিশ্বকাপ মানেই আবেগ। আর ফাইনাল? সেটা এমন এক মঞ্চ, যেখানে ৯০ মিনিটে বদলে যায় ইতিহাস, জন্ম নেয় কিংবদন্তি, আবার কখনও চোখের জলে ভেঙে যায় আজীবনের স্বপ্ন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবার রাতেও ঠিক তেমনই একটা গল্পের অপেক্ষায় থাকবে গোটা ফুটবল বিশ্ব।
একদিকে লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও যিনি প্রমাণ করে চলেছেন, প্রতিভার কোনো বয়স হয় না। চার বছর আগে কাতারের মরুভূমিতে কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিলেন তিনি। এবার সামনে আরও বড় ইতিহাস। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে ইতালি ও ব্রাজিল ছাড়া আর কোনো দল টানা দুইবার খেতাব জিততে পারেনি। মেসির আর্জেন্টিনা জিতলে সেই বিরল এলিট ক্লাবের তৃতীয় সদস্য হবে। শুধু একটি ট্রফি নয়, এটা হবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকার লড়াই।
অন্যদিকে স্পেন। ইউরোর সাফল্যের ধারাবাহিকতা টেনে এনে এবার বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ছন্দে তারা। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরো টুর্নামেন্টে যেন আধুনিক ফুটবলের পাঠ্যবই। বলের দখল, নিখুঁত পাস, দ্রুত ট্রানজিশন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ-সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগই দেয়নি স্প্যানিশরা। সাত ম্যাচে মাত্র একটা গোল হজম করাই তার প্রমাণ।


তবে এই ফাইনালকে অন্য মাত্রা দিয়েছে আরেকটি নাম-লামিন ইয়ামাল। এখনও কৈশোর পেরোনো হয়নি, অথচ এরমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বড় মঞ্চে তিনি স্পেনের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। একদিকে বিদায়বেলার আলোয় দাঁড়িয়ে মেসি, অন্যদিকে সূর্যোদয়ের মতো উজ্জ্বল এক নতুন তারকা। তাই এই ম্যাচ শুধু দুই দলের নয়, দুই প্রজন্মেরও। আর্জেন্টিনার শক্তি অবশ্য অন্য জায়গায়। এই দলটি কখনও হাল ছাড়ে না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেই তার প্রমাণ মিলেছে। পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে স্কালোনির দল। বদলি হিসেবে নেমে রদ্রিগো ডি পল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়েছেন, লাউতারো মার্টিনেজ করেছেন জয়সূচক গোল। তাই ফাইনালের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-স্কালোনি কি আবার চমক দেবেন, নাকি শুরু থেকেই অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা রাখবেন?
স্পেনেরও ভাবনার শেষ নেই। মেসিকে থামানোর দায়িত্ব শুধু লাপোর্তের নয়, রদ্রি, কুবারসি, ফাবিয়ান রুইস-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ মেসি এমন এক ফুটবলার, যিনি ৮৯ মিনিট নিঃশব্দে কাটিয়ে ৯০তম মিনিটে এক স্পর্শেই ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারেন। বিশ্বকাপে তাঁর গোল, অ্যাসিস্ট আর ম্যাচ জেতানোর গল্প তো এখন ইতিহাসেরই অংশ।


ফাইনালের আরেকটা বড়ো লড়াই হবে মাঝমাঠে। বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই মিডফিল্ডার রদ্রি ও এনজো ফার্নান্দেজ মুখোমুখি হবেন। একজন বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্যজন প্রতিপক্ষের ছন্দ ভেঙে মুহূর্তেই আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেন। যে দল এই লড়াই জিতবে, ট্রফির দিকে তারাই হয়তো এক ধাপ এগিয়ে থাকবে। ডান প্রান্তেও থাকবে আগুন ঝরা দ্বৈরথ। লামিন ইয়ামালের বিস্ফোরক গতি সামলাতে হবে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে। আবার আর্জেন্টিনার আক্রমণে জুলিয়ান আলভারেজের নিরলস প্রেসিং স্পেনের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখবে পুরো ম্যাচজুড়ে। ছোট ছোট এই লড়াইগুলোই হয়তো শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের নাম।
বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু পরিসংখ্যানের হিসাব মেনে চলে না। এখানে এক মুহূর্তের অনুপ্রেরণা, একটা ভুল, একটা সেভ কিংবা একটি জাদুকরী পাস বদলে দিতে পারে সবকিছু। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনকে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। প্রায় ছয় দশক পরে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে, তাও সরাসরি ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে, তবে কোন রঙে-আকাশি-সাদা, নাকি লাল-সেই উত্তর লুকিয়ে আছে মেটলাইফের ঘাসে। হয়তো এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাঁর শেষ নাচ। সতীর্থরা জানেন, এই মানুষটিকে হাসিমুখে বিদায় দেওয়ার সুযোগ জীবনে একবারই আসে। অন্যদিকে ইয়ামালদের সামনে সুযোগ, বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়ার-ফুটবলের নতুন যুগ শুরু হয়ে গেছে।


তাই এই ফাইনাল কেবল একটা ট্রফির লড়াই নয়। এটা অতীত ও ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়ানোর গল্প। একজন কিংবদন্তির উত্তরাধিকার অমর হয়ে থাকার লড়াই, আর এক তরুণের নতুন সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন। ৯০ মিনিট পরে ট্রফি উঠবে এক দলের হাতে, কিন্তু ফুটবল পাবে আরেকটি কালজয়ী গল্প-যে গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলা হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *