ওই ঘাসে..তোর টিমে..তোর পাশে… মোহনবাগানের দিদা শেষবার সমর্থন জানাতে এলেন ক্লাবে

0

শুক্রবার যেন হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল ময়দানের এক চেনা শব্দ-গ্যালারির ভিড়ে ভেসে ওঠা সেই পরিচিত কণ্ঠ। নেই ‘মোহনবাগান দিদা’ শান্তি চক্রবর্তী। তবুও, তাঁকে না দেখেও যেন তাঁকেই খুঁজে ফিরছে সবুজ-মেরুন গ্যালারি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শনিবার দুপুরে যখন তাঁর নিথর দেহ পৌঁছয় মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে, তখন তা শুধু বিদায় ছিল না-তা ছিল এক আবেগ।তিনি তো বিখ্যাত কেউ নন, তবু অশ্রুসজল চোখ সবায়ের।

শান্তি চক্রবর্তী নামটা যেন সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন শুধুই ‘মোহনবাগান দিদা’। গ্যালারির প্রতিটি উল্লাসে, প্রতিটি স্লোগানে, প্রতিটি জয়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। তাঁর হাসি যেন ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে, আর হারলেও সেই হাসিতেই লুকিয়ে থাকত অদম্য ভরসা- ‘আবার জিতব।’ জীবন তাঁকে খুব বেশি কিছু দেয়নি। মধ্য কলকাতার অক্রুর দত্ত লেনের ছোট্ট, ভাঙাচোরা ঘরেই কেটেছে তাঁর দিনযাপন। ছিল না প্রাচুর্য, ছিল না স্বাচ্ছন্দ্য-কিন্তু ছিল এক সমুদ্রভরা ভালোবাসা, যা তিনি উজাড় করে দিয়েছেন মোহনবাগানের জন্য।
যখন তিনি ‘দিদা’ হয়ে ওটেননি, তখন থেকে রেডিওর সামনে বসে শ্যাম থাপার খেলা শুনতেন। সময় বদলেছে, যুগ এগিয়েছে-কিন্তু তাঁর ভালোবাসা একটুও কমেনি। বয়সের ভার, শরীরের ক্লান্তি, ব্যক্তিগত দুঃখ-কিছুই তাঁকে আটকাতে পারেনি। মোহনবাগানের জন্য কেঁদেছেন। মোহনবাগানের জন্য হেসেছেন। মোহনবাগানের জন্য সবুজ মাঠে ছুটে এসেছেন। মেয়েকে হারানোর পরও নাতনির হাত ধরে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন গ্যালারিতে, নিজের দলের পাশে দাঁড়াতে। একসময় যখন গ্যালারিতে মহিলা সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল বিরল, তখনই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক পথপ্রদর্শক। ২০১৫ সালে ‘লেডি মেরিনার্স’-এর অন্যতম প্রাণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু সমর্থক নন, ছিলেন অনুপ্রেরণা। মোহনবাগানের প্রতি তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ‘সেরা সমর্থক’-এর সম্মান। কিন্তু আসলে, তাঁর পরিচয় কোনও পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়—তিনি ছিলেন এক আবেগ, এক ইতিহাস।
আজ তিনি নেই। তবুও ম্যাচের দিনে, সবুজ-মেরুন জার্সির ঢেউ উঠলে, গ্যালারির কোথাও না কোথাও যেন ভেসে উঠবে সেই পরিচিত মুখ, সেই হাসি, সেই অদম্য ভালোবাসা। কারণ ‘মোহনবাগান দিদা’ শুধু একজন মানুষ নন-তিনি এক চিরন্তন অনুভূতি, যা কখনও হারিয়ে যায় না।হারিয়ে যেতে পারে না।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *