গ্রাম ভারতের শক্তিতে সৌর বিপ্লব, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক ভারত

0

বর্তমানে ভারত সৌরশক্তির ভাণ্ডার হিসাবে বিশ্বমঞ্চে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। বছরে ১,০৮,০০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টারও বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশটি জাপান-কে পিছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে শুধু বড় বড় মেগাসিটিই নেই, বড় ভূমিকা নিয়েছে দেশের গ্রামাঞ্চল ও সাধারণ মানুষ।একটা সময় ছিল যখন যথাযথ প্রযুক্তি ও শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণে গ্রামগুলি পিছিয়ে পড়ত।তবে শিল্পক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে গ্রামগুলির অবদানও মনে রাখার মতো।

এই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম যাত্রা শুরু হয় কোলহাপুর থেকে ১৪ কিমি দূরে শেলাকেওয়ারি গ্রাম থেকে।যা বর্তমানে দেশের সকলের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা।শুরুতে গ্রাম পঞ্চায়েত বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় লোকেদের সৌরপ্যানেল বসানোর কথা জানান দেয়। তবে ভয় পেয়েছিল স্থানীয় মানুষরা, কারণ গ্রামের মানুষদের আর্থিক ক্ষমতা তেমন ছিল না। তবে প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে গ্রামের পরিবারগুলি নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী অর্থ জোগাড় করে।কেউ ৫ হাজার, কেউ ১০ হাজার দিয়ে সাহায্য করতে থাকে।কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামে একের পর এক বাড়িতে সৌর প্যানেল বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।বর্তমানে শেলাকেওয়ারি গ্রাম সম্পূর্ণ সৌরনির্ভর।যেখানে মাসিক বিদ্যুৎ বিল ২০০০ টাকা ছাড়িয়ে যেত, এখন তা নেমে এসেছে ১০০ টাকা।

একইভাবে মোঢেরা নামক একটি গ্রাম ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ সৌরচালিত গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে ৬ মেগাওয়াটের সৌর প্ল্যান্ট ও ১,৩০০ বেশি ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেলের ব্যবস্থা রয়েছে। যার কারণে গ্রামের স্থানীয় মানুষদের বিদ্যুৎ বিল প্রায় শূন্য নেমে এসেছে। গ্রামের অনেকেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে উপার্জনও করছেন।

রাজস্থান, মহারাষ্ট্র-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রে সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কেন্দ্রের  ‘কুসুম’ প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই ৩ লক্ষের বেশি সৌর পাম্প বসানো হয়েছে। আগে বহু কৃষক রাতের অনিয়মিত বিদ্যুৎ বা খরচসাপেক্ষ ডিজেল পাম্পের উপর নির্ভর করতেন। এখন দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়ায় সেচের কাজ সহজ হচ্ছে, খরচ কমছে এবং ফসল উৎপাদনও বাড়ছে।

তবে এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কেন হয়েছে জানেন ?সাধারণত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছায়। এই দীর্ঘ পথে অনেক বিদ্যুৎ নষ্ট হয়। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে সঞ্চালনের সময় মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। তবে গ্রামেই যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তাহলে এই ক্ষতি অনেকটাই কমে এবং মানুষ নিজের বিদ্যুতের প্রতি নিয়ন্ত্রণ পান। এখানেই শেষ নয়,সৌরশক্তির প্রসারে গ্রামাঞ্চলে তৈরি হয়েছে নতুন কাজের সুযোগও। সৌরপ্যানেল বসানো থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি ও পরিচালনার জন্য স্থানীয় স্তরে বাড়ছে কর্মসংস্থান।


এই পরিকল্পনার পাশে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারও।পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিতে কেন্দ্রের ‘পিএম সূর্য ঘর যোজনা’ -র মাধ্যমে ১ কোটি পরিবারের ছাদে সৌরপ্যানেল বসানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু পরিবার এতে নাম লিখিয়েছে। এছাড়াও ,মহারাষ্ট্রের ১০০টি গ্রামকে সৌর কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করেছে। তেলেঙ্গানাতেও প্রতিটি ঘরে একটি করে সৌর প্যানেল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সৌরশক্তির এই প্রসার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক স্বস্তি, কৃষির উন্নতি, পরিবেশ রক্ষা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন। তবে ভারতের মতো দেশে এই সফলতা সৃষ্টি করেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *