এমনই ম্যাজিক, কিছুতেই মুছবে না ভোটের কালি! সব বদলেছে কালের নিয়মে, কালি বদলায়নি
সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে ভোটের ধরনও।একসময় ব্যালট পেপারে ছাপ মেরে নিজের মত জানাতেন ভোটাররা, আজ তা অতীত। এখন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে বোতাম টিপেই সেরে ফেলেন দায়িত্ব।ফলাফল জানার অপেক্ষাও আর দিনের পর দিন অপেক্ষাও করতে হয় না। একবেলার মধ্যেই মেশিনে স্পষ্ট হয়ে যায় রায়।
তবুও এই দ্রুতগতির পরিবর্তনের মাঝেই এক ছোট্ট অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রীতি আজও একই রয়ে গেছে, তা হল ভোটের কালি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে আঙুলের সেই কালচে দাগ দেখিয়ে গর্বের হাসি, সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ মানুষের এই দৃশ্য আজও অমলিন। সমাজ মাধ্যমের যুগে সেই দাগ যেন এক ‘ব্যাজ অফ অনার’। কোটি কোটি ভারতীয়ের কাছে এটা শুধু একটা চিহ্ন নয়, বরং গণতন্ত্রে অংশ নেওয়ার এক আবেগঘন সাক্ষী।
এই কালির যাত্রা শুরু ১৯৬২ সালে, দেশের তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, কেউ যেন দু’বার ভোট দিতে না পারে, আর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনওরকম জালিয়াতির সুযোগ না থাকে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হয়ে টিকে রয়েছে এই ‘অমোচনীয়’ কালি।
অদ্ভুত হলেও সত্যি, এই বিশেষ কালি সাধারণ বাজারে মেলে না। না, কোনও অনলাইন স্টোরেও পাওয়া যায় না। সারা দেশে একমাত্র কর্নাটকের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘মাইসোর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’ই এটা তৈরি করে, আর তাদের একমাত্র ক্রেতা, ভারতের নির্বাচন কমিশন। কালির গোপন ফর্মুলা এতটাই সুরক্ষিত যে সংস্থার শীর্ষকর্তারাও তা জানেন না। কেবলমাত্র দু’জন সিনিয়র কেমিস্ট মুখে মুখে প্রজন্মান্তরে সেই রহস্য বহন করে চলেছেন, যেন কোকা-কোলার ফর্মুলার মতোই এক অলিখিত ফর্মূলা।
বিজ্ঞানও এখানে কম চমকপ্রদ নয়। জানা গেছে, এই কালির প্রধান উপাদান সিলভার নাইট্রেট, যা ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এমন দাগ তৈরি করে, যা সহজে মুছে যায় না। রোদে বেরোলেই অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে সেই বেগুনি দাগ আরও গাঢ় কালচে-বাদামি হয়ে ওঠে। আঙুলের চামড়ায় কমপক্ষে ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টা, আর নখের কিউটিকলে দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয় এই চিহ্ন।
বিভিন্ন সময়ে এই কালি তোলার নানা ‘টোটকা’ শোনা গেলেও বাস্তব বলছে অন্য কথা। সাবান, লেবু কিংবা অন্য কিছুতেই পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না এই দাগ। সময়ই একমাত্র ভরসা।
ভারতেই প্রথম চালু হওয়া এই পদ্ধতি আজ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। প্রযুক্তির ঝলকানির মাঝেও তাই এই ছোট্ট দাগটাই যেন মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের আসল শক্তি এখনও মানুষের আঙুলেই। যা সহজে মোছা যায় না।
