চোখের জলে ব্রাজিলের জার্সিতে শেষ বাঁশি বাজল এক শিল্পীর, নেইমারের আক্ষেপ ঘুচল না বিশ্বকাপের
ফুটবল কখনও শুধু গোল-অ্যাসিস্টের হিসেব নয়। কখনও কখনও একজন ফুটবলার হয়ে ওঠেন একটা প্রজন্মের স্বপ্ন, আবেগ আর ভালোবাসার অন্য নাম। ব্রাজিলের জন্য নেইমার জুনিয়র ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। মাঠে বল পায়ে তাঁর হাসি, ড্রিবল, জাদুকরী পাস কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে বারবার মুগ্ধ করেছে। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা শেষ পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখা হল না তাঁর। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ম্যাচের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে দলের একমাত্র গোলটা করেছিলেন নেইমার। কিন্তু সেই গোলও হার এড়াতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার পর মেটলাইফ স্টেডিয়ামে চোখের জল আর আটকে রাখতে পারেননি ৩৪ বছরের এই মহাতারকা। গ্লোভো টিভিকে তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি… সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো।’কয়েকটি শব্দেই যেন ধরা পড়ল ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত যন্ত্রণা।
অদ্ভুত এক নিয়তি! ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের জার্সিতে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর। আর ১৬ বছর পর সেই একই মাঠেই শেষ হয়ে গেল আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক বর্ণময় অধ্যায়। ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮টি অ্যাসিস্ট। দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের স্রষ্টা। কিন্তু তাঁর কেরিয়ারের গল্পে সবচেয়ে বড় শূন্যস্থান হয়ে রইল বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে চোট, ২০১৮-তে কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০২২-এ টাইব্রেকারের হতাশা, আর ২০২৬-এ শেষ ষোলো থেকেই বিদায়-প্রতিবারই স্বপ্নটা এসে থেমে গেল হাতছোঁয়া দূরত্বে। ক্লাব ফুটবলে তিনি জিতেছেন অসংখ্য ট্রফি। দেশের হয়ে জিতেছেন ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ, ২০১৬ রিও অলিম্পিকে অধিনায়ক হিসেবে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক সোনার পদক। তবু বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপই যেন তাঁর ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে রইল। অনেকেই নেইমারকে বিচার করবেন পরিসংখ্যান দিয়ে। কিন্তু যাঁরা তাঁর ফুটবল দেখে বড় হয়েছেন, তাঁরা জানেন-নেইমার শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন আনন্দের আরেক নাম। বল পায়ে তাঁর ছন্দ, সাহস আর সৃজনশীলতা ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করেছিল।সব কিংবদন্তির গল্প ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। কিছু গল্প লেখা হয় মানুষের চোখের জলে, অপূর্ণ স্বপ্নে আর অগণিত ভালোবাসায়। নেইমারের গল্পও তেমনই। বিশ্বকাপ তাঁর হাতে উঠল না, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল থাকবেন সেই ছেলেটা হয়ে, যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করত-স্বপ্ন একদিন সত্যি হবেই।
হয়তো এটাই নেইমারের সবচেয়ে বড় জয়।
