শতবর্ষের সুর থামল, প্রয়াত বিষ্ণুপুর ঘরানার কিংবদন্তি অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
কিছু মানুষের মৃত্যু থামিয়ে দেয় গোটা একটা সময়কে। এ বার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আকাশ থেকে খসে পড়ল আরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।প্রয়াত বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক ও প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।গুরু পূর্ণিমার দিনই না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী।বুধবার দুপুর ২:৩০ নাগাদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি জীবনের ১০০ বছর পার করেছিলেন তিনি।তবে বয়সকে পাত্তা না দিয়ে নিজের শিল্পের প্রতি শেষদিন অবধি নিষ্ঠা রেখেছিলেন তিনি।তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা সঙ্গীতজগতে।
সূত্রের খবর,সম্প্রতি কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল।হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় বর্ষীয়ান শিল্পীকে।চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও বুধবার দুপুরে আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি।শেষ পর্যন্ত সমস্ত লড়াই থামিয়ে চিরবিদায় নেন শতবর্ষের এই সুরসাধক।
উল্লেখ্য,১৯২৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি উত্তর কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত পরিবারে জন্ম অমিয়রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের। বাবা পণ্ডিত সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা।পরে বহু গুণী শিল্পী ও শিক্ষকের কাছে তালিম নিয়ে নিজের স্বতন্ত্র সঙ্গীতভাবনা গড়ে তোলেন।তাঁর কাছে রাগের ব্যাখ্যা,শব্দের উচ্চারণ, প্রতিটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।তবে শুধু মঞ্চের শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা করে পরে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও সামলেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। সঙ্গীত ও শিল্পভাবনা নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের কাছে মূল্যবান সম্পদ।তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমানে এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন পুত্র পণ্ডিত শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়।
দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে তিনি সঙ্গীত মহাসম্মান, ভীষ্মদেব পুরস্কার, গিরিজাশঙ্কর পুরস্কার-সহ অসংখ্য সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন।রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিধু-কানহু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. লিট প্রদান করে সম্মান জানায়।শতবর্ষের জীবনে নিজের সাধনা ও নিষ্ঠা দিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে শিল্পীদের কাছে বয়স আদতেই একটি সংখ্যা।পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হারাল এক নিষ্ঠাবান শিল্পীকে। গুরু পূর্ণিমার দিনে থেমে গেল এক গুরু এবং শিল্পীর কন্ঠ।তবে শিল্পীরা আজীবন অমর।তিনি চলে গেলেও অসংখ্য মানুষের কাছে থেকে যাবে তাঁর সুর, কন্ঠ এবং আদর্শ।বিষ্ণুপুর ঘরানার যে প্রদীপ তিনি জ্বালিয়ে ছিলেন, তা থেকে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে।
