একটি বিদায়, আর এক জীবনের ভালবাসা – লিওনেল মেসি
১৯ জুলাই। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। চারপাশে তখন স্পেনের উৎসব। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতছে লা রোহা। আর মাঠের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে এক জোড়া চোখ দিয়ে নেমে আসছে জল। লিওনেল মেসি তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না- আর এক বার বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠেও ট্রফিটা তাঁর হল না। ২০২২-এর সেই স্বপ্নের পর আরও এক বার ফাইনালে এসে থেমে গেল আর্জেন্টিনা। আর সেই রাতেই হয়তো নিজের ভিতরে একটি দরজা বন্ধ করে ফেলেছিলেন তিনি। ফুটবল বিশ্ব অবশ্য তখনও জানত না, মেসির চোখের জল আসলে বিদায়েরও ইঙ্গিত।
ঠিক দু’দিন পর, ২১ জুলাই, মেসি লিখে ফেলেছিলেন সেই চিঠি। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক জীবনের শেষ অধ্যায়। তখনও প্রকাশ করেননি। হয়তো কিছুটা সময় চেয়েছিলেন। হয়তো নিজের সঙ্গে শেষ বার কথা বলতে চেয়েছিলেন। অথবা হয়তো নীল-সাদা জার্সিটাকে ছেড়ে দেওয়ার আগে আরও কিছুটা সময় তার কাছে থাকতে চেয়েছিলেন।
এরপর এল আরও এক আঘাত। চলে গেলেন বাবা জর্জ মেসি। যে মানুষটি রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটির চোখে প্রথম বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে কিশোর মেসিকে একদিন বার্সেলোনার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই মানুষটাই আর রইলেন না। শোকের মধ্যে আরও কিছুদিন নীরব থাকলেন লিও। তারপর ৩১ আগস্ট নিজের সমাজ মাধ্যমে প্রকাশ করলেন সেই চিঠি। অবশেষে সত্যিটা সামনে এল- আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাঁকে।
কী অদ্ভুত একটা যাত্রা! ২০০৫ সালে শুরু। সেই সময় মেসি ছিলেন এক রোগা, লাজুক কিশোর। প্রতিভা ছিল, কিন্তু দেশের জার্সিতে সাফল্যের নিশ্চয়তা ছিল না। বরং একের পর এক ফাইনাল হার, সমালোচনা আর হতাশা তাঁকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। একসময় তো অভিমানে বলেই ফেলেছিলেন, আর নয়। কিন্তু মেসি ফিরে এসেছিলেন। তারপর বদলে গেল গল্পটা। ২০২১-এ কোপা আমেরিকা। ২০২২-এ বিশ্বকাপ। তার আগে ফাইনালিসিমা। যে দেশের হয়ে বছরের পর বছর কাঁদতে হয়েছে, সেই দেশকেই একের পর এক ট্রফি এনে দিলেন তিনি। কাতারের রাতটা তো আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভাসে—বিশ্বকাপ হাতে মেসি, চোখে জল, মুখে অবিশ্বাস আর বুকের মধ্যে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের আনন্দ। সেই মেসিই আরও এক বার বিশ্বকাপের ফাইনালে গেলেন ২০২৬-এ। কিন্তু এ বার গল্পটা তাঁর মনের মতো হল না। স্পেনের কাছে ১-০ হার। ট্রফি হাতছাড়া। তবে হয়তো সেই রাতেই তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই।
নিজের চিঠিতে মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু এখন নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার সময়। জাতীয় দলের হয়ে প্রতিবার নিজের সর্বস্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। দেশের মানুষকে গর্বিত করতে চেয়েছেন। এবার মাঠের বদলে গ্যালারি থেকে সেই কাজটাই করবেন। এ যেন বিদায় নয়, ভূমিকা বদল। যে মানুষটির পায়ে বল থাকলে গোটা গ্যালারি নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করত, তিনি এবার সেই গ্যালারিতেই বসবেন। অন্য কেউ গোল করলে হাততালি দেবেন। আর্জেন্টিনা জিতলে অন্য সবার মতোই আনন্দ করবেন। শুধু আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না ১০ নম্বর জার্সিতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর শেষ ম্যাচ তাই হয়ে রইল বিশ্বকাপ ফাইনাল। শেষ ম্যাচে ট্রফি জেতা হয়নি। কিন্তু সব গল্পের শেষটা ট্রফি দিয়ে লেখা হয় না। কিছু গল্প লেখা হয় মানুষের হৃদয়ে।
মেসির গল্পটাও তেমন।
২০ বছরের আন্তর্জাতিক সফরে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০-র বেশি ম্যাচ, শতাধিক গোল, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা, বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে তিনি শুধু রেকর্ডের পাতায় থাকবেন না। থাকবেন সেইসব মানুষের স্মৃতিতে, যারা রাত জেগে তাঁর খেলা দেখেছে। গোলের পর দু’হাত তুলে তাঁকে ছুটতে দেখেছে। হারের পর তাঁর চোখের জল দেখে নিজেরাও কেঁদেছে। আর ২০২২-এ তাঁকে বিশ্বকাপ হাতে দেখে মনে করেছে, স্বপ্ন বুঝি সত্যিই ছোঁয়া যায়। আজ সেই স্বপ্নের কারিগর নিজেই বলছেন, এবার থামার সময়।
তবু মেসিকে থামানো যাবে কি? মাঠ থেকে হয়তো। স্মৃতি থেকে নয়। নীল-সাদা জার্সি থেকে হয়তো। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয় থেকে নয়। কারণ কিছু ফুটবলার খেলা শেষ করেন। কিছু ফুটবলার একটা যুগ শেষ করে যান।

লিওনেল মেসি তাঁদেরই একজন।
ছবি সৌজন্যে এক্স ( Image courtesy: X handle)
