সাফল্য আছে, তবু আত্মসন্দেহ! বিরাট কোহলির কথায় ফের চর্চায় ইমপোস্টার সিনড্রোম
ক্রিকেটে অসংখ্য রেকর্ড, ট্রফি এবং সাফল্যের মালিক বিরাট কোহলি। বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন এক অনুভূতির কথা প্রকাশ্যে জানান, যা বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছেই পরিচিত। কোহলি বলেন, ‘সবসময় মনে হয় আমি যথেষ্ট ভালো নই। ইমপোস্টার সিনড্রোম সবসময়ই কাজ করে।’ এমনকি তরুণ ক্রিকেটাররা তাঁর নেট সেশন দেখলেও নিজের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে তাঁর মনে। বিরাট কোহলির এই অকপট স্বীকারোক্তির পরই ফের আলোচনায় এসেছে ইমপোস্টার সিনড্রোম। মনোবিদদের মতে, এটা কোনও স্বীকৃত মানসিক রোগ নয়। বরং এটা এমন একটা মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের সাফল্য বা যোগ্যতা নিয়ে বারবার সন্দেহে ভোগেন। এর সঙ্গে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা এবং মানসিক চাপের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে থাকলে তা মানসিক সুস্থতা, কর্মদক্ষতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
কী এই ইমপোস্টার সিনড্রোম?
মনোবিদদের ভাষায়, ইমপোস্টার সিনড্রোম এমন একটা মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা বা দক্ষতা নিয়ে সবসময় সন্দিহান থাকেন। বাস্তবে তিনি সফল হলেও সেই সাফল্যকে নিজের পরিশ্রম বা প্রতিভার ফল বলে বিশ্বাস করতে পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের কোনও না কোনও সময়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ এই ধরনের অনুভূতির মুখোমুখি হতে পারেন। তবে প্রতিযোগিতামূলক পেশা, উচ্চ প্রত্যাশা এবং নিজেকে সবসময় প্রমাণ করার চাপ থাকলে এই অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
কেন হয় এই সমস্যা?
মনোবিদদের মতে, ইমপোস্টার সিনড্রোমের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন—
• নিজের প্রতি অতিরিক্ত উচ্চ প্রত্যাশা বা পারফেকশনিস্ট মানসিকতা।
• সবসময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা।
• ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত সমালোচনা বা অন্যের সঙ্গে তুলনা।
• কর্মক্ষেত্র বা পড়াশোনায় অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা।
• সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের সাফল্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা।
• নতুন দায়িত্ব বা বড় কোনও সাফল্যের পর নিজেকে সেই জায়গার যোগ্য মনে না হওয়া।
কাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধু ছাত্রছাত্রী বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং উচ্চ সাফল্য পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই এটা বেশি দেখা যায়। খেলাধুলো, কর্পোরেট জগৎ, চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা এবং নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্র, যেখানে সবসময় ভালো পারফরম্যান্সের চাপ থাকে, সেখানে ইমপোস্টার সিনড্রোমের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
কীভাবে মুক্তি মিলতে পারে?
• ছোট ছোট সাফল্য লিখে রাখুন এবং সেগুলি উদযাপন করুন।
• নিজের দক্ষতার কাজ, যেমন ছবি আঁকা, গান, লেখা বা অন্য কোনও সৃজনশীল কাজ নিয়মিত চর্চা করুন এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন।
• অন্যের সঙ্গে অযথা তুলনা করা বন্ধ করুন।
• সব সময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা না করে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমপোস্টার সিনড্রোম কোনও দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং এটা এমন একটা মানসিক অবস্থা, যা সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর অনুশীলন এবং প্রয়োজনে পেশাদার পরামর্শের মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। বিরাট কোহলির মতো বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদের অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে, সাফল্য যত বড়ই হোক না কেন, আত্মসন্দেহের সঙ্গে লড়াই অনেকের জীবনেই বাস্তব। তাই এই অনুভূতিকে লুকিয়ে না রেখে তা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা এবং প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়াই হতে পারে সুস্থ মানসিক জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
