টিভির নেশা ছাড়াতে দাবা, ভাই প্রজ্ঞানন্দের সাফল্যের চাপ-সব পেরিয়ে চ্যাম্পিয়ন বৈশালী

0



টিভির নেশা ছাড়াতে মেয়েকে দাবার অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করেছিলেন বাবা। সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তই আজ ভারতীয় দাবার ইতিহাস বদলে দিয়েছে। চেন্নাইয়ের সেই মেয়েটাই আজ বৈশালী রমেশবাবু, যিনি মহিলাদের ক্যান্ডিডেটস ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এই নজির গড়ে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে ক্যান্ডিডেটস জিতলেন বৈশালী। শেষ রাউন্ডে ক্যাটেরিনা লাগনোকে হারিয়ে সাড়ে সাত পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেন তিনি। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জু ওয়েনজুনের বিরুদ্ধে ‘চ্যালেঞ্জার’ হিসেবে নামার সুযোগ পেলেন।


যেন ছায়া ছেড়ে আলোর দেখা পেলেন নতুন করে। কারণ দাবার সঙ্গে বৈশালীর পথচলাটা দাবার চালের চেয়েও একসময় কঠিন হয়ে উঠেছিল। টিভি দেখার নেশা ছাড়াতে  বাবা ভর্তি করে দিয়েছিলেন স্থানীয় দাবার অ্যাকাডেমিতে। তখন বৈশালী ৭।  যে বয়সে চঞ্চল, দুরন্ত হয় সাধারণত কোনও শিশু, সেই বয়সেই স্বল্পভাষী বৈশালী এক্কেবারে শান্ত। দাবাই যেন খেলা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে বসে থাকতে পারতেন দাবার বোর্ডের দিকে চেয়ে। ছোট ভাই আর প্রজ্ঞানন্দ চার বছরের ছোট। দিদিকে দেখে দাবার বোর্ড যেন তারও রন্ধ্রে ঢুকে যায়। তারপর তো ইতিহাস! অল্প বয়সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চ কাঁপিয়ে দেন প্রজ্ঞানন্দ, হয়ে ওঠেন বিশ্বের কনিষ্ঠতমদের মধ্যে অন্যতম গ্র্যান্ডমাস্টার। ছোট্ট ভাইয়ের সাফল্যে যেন ঢাকা পরে যেতে থাকে দিদির লড়াই, দিদির প্রতিভা।


ভাইয়ের সাফল্যের ঝলকে অনেক সময় আড়ালেই থেকে গিয়েছিলেন বৈশালী। কিন্তু ১২ বছর বয়সে প্রদর্শনী ম্যাচে ম্যাগনাস কার্লসেনকে হারিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন অনেক আগেই বৈশালী। বাড়ির কারোর সংশয়ও ছিল না তার প্রতিভা দক্ষতা নিয়ে। তবু যেন ভাই বোনের ঈর্ষা ঢুকে পড়ে মধ্যবিত্তের সংসারে। ভাই বিস্ময়করভাবে জিতছে, মিডিয়া আসছে ঘনঘন বাড়িতে, কিন্তু বৈশালী দিদি হিসেবে সাক্ষাৎকার দিলেও তার সাফল্য নিয়ে খবর হয়নি। মানুষ তো, হিনমন্যতা আসাই স্বাভাবিক। অবসাদও আসত। কিন্তু ভাগ্যদেবতা যে তারও সঙ্গ দিতে ছাড়েননি। সাফল্য এসেছে দিদির, একটু যা দেরীতে।


জীবনের মোড় ঘুড়ে যায় করোনাকালে ঘরবন্দি থাকার সময়। দিদি আর ভাইয়ের ঘরবন্দি জীবনে গল্প শুরু হয় দাবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দাবাই তাদের একাত্ম করে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাপিয়ে হয়ে ওঠে তারা একে অপরের শক্তি। এরপর কামব্যাক শুরু বৈশালীর জীবনেও। তার আগেই ধাপে ধাপে এগিয়ে এসে ২০১৯ সালে প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম, তারপর পূর্ণ গ্র্যান্ডমাস্টার।
আজ বৈশালী রমেশবাবুর এই সাফল্য শুধু একটা ৬৪ খোপের জয় নয়, বরং এক দীর্ঘ মানসিক লড়াই জয়ের গল্প—যেখানে টিভির সামনে বসে থাকা এক মেয়ে থেকে বিশ্বমঞ্চের দাবাড়ু হয়ে ওঠার প্রতিটি চালই ছিল লড়াইয়ের।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *