সিঁথির সিঁদুর মুছে যাওয়ার এক বছর পরও শুকোয়নি চোখের জল! পহেলগাঁও আজও কাঁদে!
ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, বসন্ত ঘুরে এসেছে, ফুল ফুটেছে আবার, নতুন করে বরফের আস্তরণ পড়েছে, কিন্তু চোখের জল কি শুকিয়েছে?
একবছর। তবু সব টাটকা। এখনও যেন কানের পাশে বেজে ওঠে গুলির শব্দ। মোছেনি রক্তের দাগ। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁও আজও যেন সেই রক্তাক্ত দিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।
এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল। বৈসরণ উপত্যকার নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে শুরু হয়েছিল নৃশংস হত্যালীলা। চোখের সামনে মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল সবকিছু। কারও কপালের সিঁথির সিঁদুর মুছে গিয়েছিল স্বামীর রক্তে, কারও সন্তান দাঁড়িয়ে দেখেছিল বাবার নিথর দেহ। পাহাড়ি হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল শুধু কান্না-আর্তনাদ- আর অসহায় চিৎকার।
২৬ জন নিরীহ পর্যটক সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁরা কেউ এসেছিলেন কিছুটা স্বস্তির খোঁজে, আনন্দ করতে, কেউ পরিবারের সঙ্গে সুখের মুহূর্ত কাটাতে। কিন্তু বরফের দেশে সেদিন ঝরে পড়েছিল রক্ত, আর সেই রক্তের দাগ মুছে গেলেও স্মৃতি মুছে যায়নি। যে উপত্যকায় প্রতিদিন ভেসে ওঠে পাখির ডাক, সেখানে সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল গুলির শব্দ। যে পথে হাত ধরে হাঁটার কথা ছিল, সেই পথেই লুটিয়ে পড়েছিল জীবন। শোক আর আতঙ্কের সেই মুহূর্ত আজও যেন জমাট বেঁধে আছে সময়ের ভাঁজে।
হামলার পর দেশ জুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। নৃশংসতা দেখে থমকে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব। জবাব দিতে ভারতীয় সেনা চালায় অপারেশন সিঁদুর। ধ্বংস করে শত্রুদের ভারতবিরোধী একাধিক ঘাঁটি। পরে শুরু হয় অপারেশন মহাদেব, দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর খতম করা হয় হামলার মূল চক্রীদের। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, যে ঘরগুলো ফাঁকা হয়ে গেল, সেই শূন্যতা কি কখনও পূরণ হবে?
সময় পেরিয়েছে, কাশ্মীর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে ফিরছে পর্যটকদের আনাগোনা, উপত্যকায় আবার শোনা যাচ্ছে হাসির শব্দ। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে চাপা পড়ে থাকে ভয়-এক অদৃশ্য আতঙ্ক, যা ভুলতে পারে না কেউই।
এই শোক ছুঁয়ে গিয়েছিল বাংলাকেও। কলকাতার বৈষ্ণবঘাটার বিতান অধিকারী, পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে আর ফিরে যাননি। বেহালার সমীর গুহ, পুরুলিয়ার মণীশ রঞ্জন মিশ্র, স্ত্রী-সন্তানের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার সেই দৃশ্য আজও তাঁদের পরিবারের ঘুম কেড়ে নেয়। কত ঘরে সেদিন নিভে গিয়েছিল আলো, কত সিঁথি হয়ে গিয়েছিল শূন্য তার খোঁজ এখন আর কে রাখে!
তবুও জীবন থেমে থাকে না। কাশ্মীর আবার নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলো জোড়া লাগাচ্ছে। পর্যটকদের হাত ধরে আবার ফিরছে প্রাণ, কিন্তু উপত্যকার বুকের গভীরে রয়ে গেছে ২২ এপ্রিলের ক্ষত।
এই দিনেই নিহতদের স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ’এই নিরপরাধ মানুষদের আমরা কোনোদিন ভুলব না। তাঁদের পরিবারের পাশে গোটা দেশ রয়েছে।’ পাশাপাশি কড়া বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, ‘ভারত সন্ত্রাসের সামনে কখনও মাথা নত করবে না।’
এক বছর কেটে গেছে। তবুও পহেলগাঁও মানেই আজও এক বুক কান্না, একটা সিঁথির সিঁদুর মুছে যাওয়ার গল্প, এক অশেষ অপেক্ষার গল্প… যেখানে কেউ আর ফিরে আসে না, শুধু স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে।
