মার্টিনেজের প্রাচীর ভেঙে বিশ্বজয়, ১৬ বছর পর আবারও স্পেনের হাতে ফুটবলের মুকুট

0



রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান হলো ১০৬ মিনিটে। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ যতবারই স্পেনের উল্লাস থামিয়েছেন, ততবারই যেন আরও তীব্র আক্রমণ নিয়ে ফিরেছে লা রোজা। শেষ পর্যন্ত সেই অদম্য প্রতিরোধও ভেঙে পড়ল ফেরান তোরেসের দুর্দান্ত ভলিতে। অতিরিক্ত সময়ের সেই একমাত্র গোলেই আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপের সিংহাসনে বসল স্পেন।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের শুরু থেকেই ছিল স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য। বলের দখল, পাসিং, প্রেসিং, আক্রমণের গতি—প্রতিটি বিভাগেই আর্জেন্টিনাকে ছাপিয়ে যায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এমনকি নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি লিওনেল মেসির দল। বল দখলের হার নেমে আসে মাত্র ৩৪ শতাংশে, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বনিম্ন।


তবু স্কোরলাইন গোলশূন্য ছিল একমাত্র এমিলিয়ানো মার্টিনেজের জন্য। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, মিকেল মেরিনো—স্পেনের একের পর এক আক্রমণ অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন আর্জেন্টিনার এই গোলরক্ষক। ৯৪ মিনিট পর্যন্ত ১০টি সেভ করে কার্যত একাই দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
৯৬ মিনিটে অবশেষে বল জালে জড়ায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামসের ফিনিশে গ্যালারিতে উল্লাস শুরু হয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যেই সেই আনন্দ থেমে যায়। গোলের আগে মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনার গোলরক্ষকের ওপর ফাউল করেছেন বলে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। নতুন করে আশার আলো দেখে আর্জেন্টিনা।


কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনসো ফের্নান্দেস। ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে স্পেন।
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেডে বাড়িয়ে দেওয়া বল থেকে ফেরান তোরেস ডান পায়ের জোরালো ভলিতে পরাস্ত করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। এতক্ষণ যিনি অপ্রতিরোধ্য ছিলেন, সেই মার্টিনেজও আর কিছু করতে পারেননি। ২০১০ সালের জোহানেসবার্গে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার জয়সূচক গোলের স্মৃতি যেন ফিরে এল আবারও। ১৬ বছর পর ফের বিশ্বকাপের ট্রফি উঠল স্পেনের হাতে।
গোল হজমের পর শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি ফ্রি-কিক, কর্নার ও লম্বা পাসে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করেন। ১১৭ মিনিটে তাঁর জোরালো শট নিজের মুখ দিয়ে আটকে দেন মিকেল মেরিনো। যোগ করা সময়ে জুলিয়ানো সিমেওনের সামনেও সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। কিন্তু তাঁর শট উড়ে যায় ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে।


ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে ব্যবধান ছিল মাত্র এক গোল। কিন্তু ফুটবলের ভাষায় ব্যবধানটা ছিল আরও অনেক বড়। গোটা ম্যাচে স্পেনের পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের ধার ছিল চ্যাম্পিয়নসুলভ। অন্যদিকে মেসিকে কার্যত বোতলবন্দি করে রাখে স্প্যানিশ রক্ষণ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫। পুরো ম্যাচেই তিনি নিজের স্বাভাবিক প্রভাব ফেলতে পারেননি।
শেষ বাঁশি বাজতেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম লাল-হলুদ উল্লাসে ভেসে যায়। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল স্পেন। আর আর্জেন্টিনার জন্য রয়ে গেল ট্রফি হাতছাড়ার দীর্ঘশ্বাস।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *