বার ছুঁয়ে নতুন বছরের স্বপ্ন, ময়দানে বারপুজোর আবেগে আজও বাঁচে বাঙালির ফুটবল
পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন সূচনা। ক্যালেন্ডারের পাতায় বদল, মনের ভাঁজে নতুন আশার আলো। শহরের মন্দিরে ধূপের গন্ধ, দোকানে হালখাতার লাল খাতা, বইপাড়ায় নতুন পঞ্জিকার পাতায় ভবিষ্যতের হিসেব-সব মিলিয়ে একটাই ডাক, ‘এসো হে বৈশাখ’। কিন্তু এই একই দিনে, শহরের বুকেই আর এক আলাদা আবহ তৈরি হয়-ময়দানে। সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে এক টুকরো ইতিহাস, যার নাম ‘বারপুজো’।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাব তাঁবুতে জমতে শুরু করে ভিড়। কেউ পুরনো সদস্য, কেউ নতুন প্রজন্মের সমর্থক-সবাই যেন এক অদ্ভুত টানে ছুটে আসে। গোলপোস্টের সেই বার, যাকে ঘিরে বছরের পর বছর জয়ের স্বপ্ন দেখা, সেই বারই হয়ে ওঠে পুজোর আসন। পুরোহিত মন্ত্র পড়েন-তা লক্ষ্মীর না বিশ্বকর্মার, তা নিয়ে অবশ্য তর্ক থাকলেও, বিশ্বাসে কোনও খামতি নেই। শোনা যায়, ছয়-সাতের দশকে দলবদল শেষ হলেই পয়লা বৈশাখে শুরু হত নতুন মরশুম। সেই দিনই ঘোষণা হত নতুন অধিনায়কের নাম। তিনি এগিয়ে এসে বার ছুঁয়ে সংকল্প নিতেন—এই বছর জয় চাই। সেই মুহূর্তে ক্লাব, ফুটবলার আর সমর্থক—সবাই যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে যেত। পুজো শেষ হলে শুরু হত আর এক উৎসব। মোহনবাগান তাঁবুতে লুচি-বোদে-পন্তুয়ার লাইনে উপচে পড়ত ভিড়।যে ট্রাডিশন আজও চলছে। ইস্টবেঙ্গলেও সময়ের সঙ্গে বদলেছে চিত্র, এখন সেখানেও উৎসবের রঙ উজ্জ্বল। খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে গল্প, হাসি, পুরনো দিনের স্মৃতি-সব মিলিয়ে ক্লাব হয়ে ওঠে এক পরিবারের মতো।মিলনক্ষেত্র।

এই পুজোর ইতিহাস হয়তো স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার আবেগ স্পষ্ট। কেউ বলেন, বারপুজো করলে মরশুম ভালো যায়। কেউ বিশ্বাস করেন, গোলপোস্ট তখন আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না নিজের দলের পথে। আবার অনেকে বলেন, এ শুধু উপলক্ষ-একসঙ্গে থাকার, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার। কখনও বারের চারপাশে প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, পাছে কেউ ডিঙিয়ে যায়! কারণ, বিশ্বাস ছিল, বার ডিঙোনো মানেই অমঙ্গল। সেই বিশ্বাসেই গড়ে উঠেছিল এক অনন্য সংস্কৃতি, যা কলকাতার বাইরে কোথাও শোনা যায় না।

সময় বদলেছে। কর্পোরেটের ছোঁয়ায় অনেক কিছুই আজ বদলে গেছে। বাঙালির ফুটবল দলেও এখন ভিনদেশি নামের ভিড়। তবুও পয়লা বৈশাখ এলেই ময়দানে সেই পুরনো দিনের গন্ধ ফিরে আসে। কারণ, বারপুজো শুধু একটি আচার নয়, এ বাঙালির ফুটবলপ্রেমের আত্মা, যেখানে নতুন বছরের প্রথম দিনেই লেখা হয় একটাই প্রার্থনা প্রিয় দলের জয় চাই।
